ঢাকা, শনিবার ২০শে অক্টোবর ২০১৮ , বাংলা - 

কোন্দল না মিটলে আ”লীগ হারাবে এ আসন

ষ্টাফরিপোর্টার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম

বৃহঃস্পতিবার ৪ঠা অক্টোবর ২০১৮ দুপুর ০২:৫৩:৫৪

দুই দলেই এখানে সমস্যা রয়েছে। তবে দলীয় কোন্দল সরকারী দলে বেশি। এই কোন্দল মিটাতে না পারলে আওয়ামীলীগ এ আসন হারাতে পারে এমন মন্তব্য করেছেন এলাকার সাধারন মানুষ।

এদিকে নানা কারণে বিতর্কিত হয়েছিলেন ২০০৮ সালের এমপি হায়াতুর রহমান বেলাল। সেই বদনাম এখনো মুখে মুখে। পরের নির্বাচনেই তারাকান্দা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শরীফ আহমেদের সঙ্গে মনোনয়ন যুদ্ধে ‘ধরাশায়ী’ হন।ফলে অভিমানে দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন। 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এবার আড়মোড়া ভেঙে ফের সরব হচ্ছেন তিনি।  তবে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি হায়াতুর রহমান বেলাল মনে করেন, ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনে দলের সব জরিপে মনোনয়ন দৌড়ে তিনিই এগিয়ে রয়েছেন।

তবে বর্তমান এমপি শরীফ আহমেদ  বলেন, ‘গত ৫ বছরে ফুলপুরে রেকর্ড উন্নয়ন হয়েছে। ফুলপুর ডিগ্রি কলেজসহ একাধিক স্কুল-কলেজ সরকারিকরণ হয়েছে। বহু রাস্তাঘাট করেছি। অবহেলিত গ্রামেও উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। ভোটারদের পাশে থেকেই সব সময় এলাকার উন্নয়নেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। দলের সব নেতাকর্মীও আমার পাশে রয়েছেন। নেত্রী মনোনয়ন দিলে আবারো আসনটি উপহার দেবো।’

শরীফের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ না থাকলেও অবশ্য দলের একাংশের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, কাজকর্মে তরুণদের প্রাধান্য দেওয়ায় প্রবীণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া ‘সময়জ্ঞান’ নিয়ে ক্ষুব্ধ এলাকার মানুষ।

অভিযোগ রয়েছে, দলের কোনো কর্মসূচি সকালে থাকলে এমপি শরীফ বিকেলে হাজির হন। বেশ কয়েকবার উপহার হিসেবে সোনার নৌকা গ্রহণ করেও সমালোচিত হয়েছেন।অবশ্য এসব বিষয়কে মনোনয়ন ইস্যুতে বড় ফ্যাক্টরই মনে করেন না তার সমর্থিত নেতাকর্মীরা।

প্রায় তিন লক্ষাধিক ভোটারের এই আসনটি আওয়ামী লীগের ‘দুর্গ’ হিসেবেই পরিচিত। এখান থেকে পাঁচবার এমপি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন শরীফ আহমেদের বাবা প্রয়াত রাজনীতিক এম শামসুল হক। একবার তিনি উপজেলা চেয়ারম্যানেরও দায়িত্ব পালন করেন। এই আসনটিতে মাত্র একবার জয়লাভ করে বিএনপি। ২০০১ সালে এখানে ভোটে জিতেন দলটির প্রার্থী শাহ শহীদ সারোয়ার।

এই আসনটিতে ক্ষমতাসীন দল থেকে তারাকান্দা উপজেলা পরিষদের নব-নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও স্থানীয় উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ফজলুল হক, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার আবুল কালাম আজাদ লিটন, ফুলপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল হেকিম সরকার, আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য ও আনন্দমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস অধ্যাপক গোলাম ফেরদৌস জিল্লু ও ফুলপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ কুতুব চৌধুরী মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন।

মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়েও এই দৌড়ে নিজেকে দ্বিতীয় কাতারেই হিসাব করছেন ফুলপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল হেকিম সরকার। এই প্রবীণ নেতার ভাষ্য হচ্ছে- ‘দলে শরীফ আহমেদ বিকল্পহীন।’

বিষয়টি খোলাসা করে তিনি বলেন, ‘সাবেক সংসদ সদস্য হায়াতুর রহমান বেলাল একবার এমপি হয়েই দলকে ডুবিয়েছেন। তার কাছে কেউ গেলে তিনি কুতুব চৌধুরীকে দেখিয়ে দিতেন। আসলে তিনি অনিয়ম-দুর্নীতি করে পয়সাপাতি কামিয়েছেন সব কুতুবের মাধ্যমেই। আর কুতুবও তার বদৌলতে কোটিপতি হয়ে নিজের আখের গুছিয়েছেন। মনোনয়ন হারিয়ে তিনি দল থেকে পদত্যাগও করেছিলেন।’

দলটির আরেক আলোচিত মনোনয়ন প্রত্যাশী বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্য ব্যারিস্টার আবুল কালাম আজাদকে স্বাধীনতা বিরোধী পরিবারের সন্তান হিসেবেও অভিযুক্ত করেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হেকিম সরকার। তিনি বলেন, ‘ব্যারিস্টারের ভাই-ভাতিজারাও বিএনপি করে। তিনিই কেবল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।’

এ বিষয়ে ব্যারিস্টার আবুল কালাম আজাদ লিটন বলেন, ‘আমার আব্বার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন। কিন্তু সে আমার পরিবারের ভেতরে পড়ে না। এখন মানুষকে ঘায়েল করার প্রধান হাতিয়ার রাজাকার ও শিবির বলা।’

সংসদ সদস্য শরীফ আহমেদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতার কারণেই দুর্নাম হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘হেকিম কমান্ডারের ছেলে হত্যা মামলার আসামি। তাই নিজের ছেলেকে বাঁচাতে এবং এমপির (শরীফ আহমেদ) বাইরে তার যাওয়ার সুযোগ নেই।’

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে দলীয় এমপি শরীফ আহমেদ এখনো দুই উপজেলাতেই একক আধিপত্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আর দীর্ঘদিন সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি এখনো স্থানীয়ভাবে কোন্দলে কাবু।

এই আসনটিতে দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য শাহ শহীদ সারোয়ারকেই নিজেদের ‘ভাবী’ প্রতিদ্বন্দ্বী ধরেই ভোটের ছক কষছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সারোয়ারের বাবা রজব আলী ফকির ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য এবং ময়মনসিংহ জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য।

তার বিরুদ্ধে একাত্তরে ফুলপুরের তৎকালীন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ডা. আবু তাহের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ বেশ পুরানো। এরপরও দলে ও এলাকায় তার পরিবারের এখনো প্রভাব ও জনভিত্তি দু’টিই রয়েছে বলে মনে করেন তার অনুসারী নেতাকর্মীরা।

আসনটিতে তারাকান্দা উপজেলা পরিষদের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক ছাত্র নেতা মোতাহার হোসেন তালুকদার, ফুলপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল বাশার আকন্দ, ফুলপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ এনায়েত উর রহমান, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির ময়মনসিংহ বিভাগীয় সহ-সভাপতি সুজাউদ্দৌলা সুজা, ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রদলের সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জোবায়েদ হোসেন শাকিলও দলের মনোনয়ন চান।

অমায়িক ভদ্র ও বিনয়ী সুজাকে ঘিরে উজ্জীবীত দলটির তরুণ নেতাকর্মীরা। ফলে তাকে ঘিরে দলীয় মনোনয়ন রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটতে পারে বলেও মনে করেন তারা।

স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পর তারাকান্দা উপজেলা পরিষদের শেষ নির্বাচনে মোতাহারের ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে বিএনপিকে। দলের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতাকে বাদ দিয়ে আনকোড়া প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ায় মাত্র ছয় হাজার ভোট পেয়েছেন তিনি।

অথচ দলটির মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ১৮ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন। এই হিসাব-নিকাশই মনোনয়ন দৌড়ে মোতাহারকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে বলে দলটির একাংশের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ।উপজেলা চেয়ারম্যান হয়ে দলের প্রতিটি কর্মসূচিতে মোতাহার সক্রিয় থাকলেও দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন উপহার দিতে পারেননি।

তবে জামানত হারানোর শঙ্কাতেই নিজে প্রার্থী না হয়ে ‘দুর্বল’ প্রার্থীকে দলীয় মনোনয়ন এনে দিয়েছেন বলে সারোয়ারের অনুসারীদের অভিযোগ।নিজেকে মনোনয়ন লড়াইয়ে ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী’ উল্লেখ করে শাহ শহীদ সারোয়ার বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য আমার প্রস্তুতি সব সময় রয়েছে। মোতাহার কিংবা আবুল বাশার আকন্দের এমপি নির্বাচন করার মতো যোগ্যতা হয়নি। আমি ওয়ার্ক করে ওদের দু’জনকেই উপজেলা নির্বাচনে জিতিয়েছি।

‘মোতাহার আমার হাতে-পায়ে ধরে নিজের ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ভাইয়ের নমিনেশন নিয়ে মাত্র ৯০০ ভোট নিতে পেরেছে। নিজের এলাকাতেই ওর পরিবারের জনসমর্থন নেই। এবার জামানত হারানোর ভয়ে নিজে নির্বাচন না করে ধানের শীষ ডুবিয়েছে।’

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার বলেন, ‘আমি সারোয়ারের আগে থেকে বিএনপি করি। দুর্দিনে দলের লড়াই-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে আসছি। আমি-ই তাকে এমপি বানিয়েছিলাম। এবার মনোনয়নের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’

তিনি শাহ শহীদ সারোয়ারের অভিযোগের ব্যাপারে বলেন, ‘আমার ভাই জামানত হারায়নি, ১৫০০ ভোট পেয়েছে। জামানত হারানো নিয়ে সারোয়ার বা তার অনুসারীদের বক্তব্যও মনগড়া।’