ঢাকা, শনিবার ৭ই ডিসেম্বর ২০১৯ , বাংলা - 

৩৬ কোটি টাকা জরুরি ডেঙ্গু বরাদ্দ বাতিল

বিশেষ প্রতিনিধি।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম

শনিবার ১৬ই নভেম্বর ২০১৯ দুপুর ১২:৪৫:১৯

অবশেষে বাতিল করা হলো ডেঙ্গু জ্বর মোকাবেলার কথা বলে অনুমোদন করা স্বাস্থ্য সচিবের বিতর্কিত সেই বিশেষ অর্থবরাদ্দ। গত প্রায় আড়াই মাস ধরে এই বরাদ্দ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নানাস্তরে টানাহেঁচড়া ও টানাপোড়েন চলছিল। সে অর্থ বরাদ্দ বাতিলের মধ্যদিয়ে অবশেষে এ টানাপোড়েনের অবসান ঘটেছে বলে মনে করছেন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।  

গত জুলাই মাসের শেষের দিক থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করতে থাকে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দুর্নীতি-লুটপাটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেয়ার জন্য স্বাস্থ্যখাত কেন্দ্রীক একটি চিহ্নিত দুর্নীতিবাজচক্র বেপরোয়া হয়ে উঠে। এরা স্বাস্থ্যসচিবকে ম্যানেজ করে রাজধানীর ছয়টি হাসপাতালে সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দের জন্য রাতারাতি একদিনের মধ্যেই প্রস্তাব তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।

সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলো অর্থবছরের শুরুতে নতুন কোনো বরাদ্দ চাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না। তারা নিজে থেকে চায়ও নি। দুর্নীতিবাজচক্রটি স্বাস্থ্যসচিবকে দিয়ে হাসপাতালগুলোতে ফোন করিয়ে জরুরিভিত্তিতে ফ্যাক্স ও ই-মেইলযোগে প্রস্তাব আনার ব্যবস্থা করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের বাজেট উইংয়ের কর্মকর্তাদের বাধ্য করা হয়েছিল একদিনের মধ্যে প্রস্তাব তৈরি করে অর্থমন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য।

কিন্তু সেই অতিজরুরি বরাদ্দ প্রস্তাব অর্থমন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন হয়ে আসার পর প্রায় আড়াই মাসেরও বেশি সময় ধরে ব্যাপক দরকষাষির পর অবশেষে তা বাতিল করা হলো।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ছয়টি হাসপাতালের জন্য ৩৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা চেয়েছিল। অর্থমন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এমএসআর খাত এবং সাধারণ থোক বরাদ্দ খাত থেকে ছয়টি হাসপাতালের জন্য এই টাকা বরাদ্দের অনুমোদন দেয়। এই টাকার মধ্যে সবচে’ বেশি বরাদ্দ পাবার কথা ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ৪ কোটি ১০ লাখ টাকা, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় থেকে গত ৩০ জুলাই অর্থমন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এর পরদিনই অর্থাৎ ৩১ জুলাই অর্থমন্ত্রণালয়ের বাজেট-৪ অধিশাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মো. তাজুল ইসলামের স্বাক্ষরে প্রস্তাব অনুমোদনের চিঠিটি স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

প্রথম কথা হলো, অর্থবছরের তখন সবেমাত্র শুরু। সরকারি অর্থ খরচের ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে, যে খাতে যতটা বরাদ্দ আছে সেটি আগে খরচ করতে হবে। এরপর নতুন করে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া যাবে। এই সময়ে সরকারি প্রত্যেকটি হাসপাতালেই এমএসআর খাতে পর্যাপ্ত অর্থবরাদ্দ রয়েছে। সরকারি বাজেটের এক কানাকড়িও তখন পর্যন্ত খরচ হয়নি। তারপরও কেন এই সময়ে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হলো, সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর কেউই যুক্তিযুক্ত জবাব দিতে পারছেন না।

দ্বিতীয়ত, জরুরি প্রয়োজনে বরাদ্দ হলে সেটি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব অনুমোদন হয়ে আসার পর দীর্ঘ আড়াই মাস টানাপোড়েন চললো কেন? নিয়ম অনুযায়ী, জরুরি এই বরাদ্দের চিঠি সেদিন অথবা পরের দিনই ইস্যু হয়ে চলে যাবার কথা। আর এই অর্থ বরাদ্দের যদি প্রয়োজন না হয়েই থাকে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করা হলো না কেন?

এ প্রশ্নগুলো দেখা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, হাসপাতালগুলো আসলে এই বরাদ্দ চায়ও নি। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম এ হাসপাতালগুলোতে ফোন করে চাহিদা আনার ব্যবস্থা করেন। এবং অতিরিক্ত সচিব সিরাজুল ইসলামকে এক পায়ে দাঁড় করিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এখন প্রশ্ন হলো, সচিব কেন নিজে থেকে এতো অতি উৎসাহী হয়ে কাজগুলো করলেন, তিনি তো নিজেকে সৎ কর্মকর্তা বলে দাবি করে থাকেন? এ প্রশ্নটির যথাযথ উত্তর কেউ দিতে পারেননি। উত্তর জানার জন্য সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের পক্ষ থেকে সচিব আসাদুল ইসলামের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে সম্ভব হয়নি।

শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এ সময় বিদেশে ছিলেন। যতোটা জানা গেছে, এতোবড় একটা জরুরি বিষয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে ফোনেও আলাপ করে নেননি সচিব। ইতিমধ্যে মন্ত্রী দেশে এসে ঘটনা জানার পর এ নিয়ে গোলমাল বেধে যায়। তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। মন্ত্রীর কাছে এই মর্মে অভিযোগ আসে যে, তার অবর্তমানে তড়িঘড়ি এ অর্থ বরাদ্দের পেছনে একটি বিশেষ দুর্নীতিবাজচক্রের স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। বরাদ্দের জন্য ইতিমধ্যে ঘুষ বা কমিশনের অর্থও লেনদেন হয়ে গেছে। অথচ তিনি বাদ পড়েছেন। মন্ত্রণালয়ের বাজেট উইংয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একসঙ্গে বদলির নির্দেশ দেন, পাশাপাশি এই অর্থ বরাদ্দের চিঠি ইস্যু না করারও নির্দেশ দেন।

মন্ত্রণালয়ের বাজেট উইংয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পড়েন মহাআতংক ও মহাবিপাকে। কারণ, তারা এ বরাদ্দের বিষয়ে পূর্বাপর কিছুই জানতেন না। শুধুমাত্র সচিব তাদের ঘাড়ের উপর দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তাব তৈরি করার জন্য নির্দেশ দেয়ায় তারা এটি করতে বাধ্য হন। কিন্তু মন্ত্রী সেটি জানতেন না। তিনি ভেবেছিলেন, বাজেট উইংয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সিন্ডিকেট করে তার অবর্তমানে সচিবকে ভুল বুঝিয়ে এ বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছেন। তবে এই বরাদ্দের নেপথ্য এবং আসল কারণটি কে মন্ত্রীর কানে তুলবে এ নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। কারণ, সত্য ঘটনাটি তুলে ধরতে গেলে সচিবের বিরুদ্ধেই অভিযোগ করা হয়ে যায়। মন্ত্রীর নির্দেশের পর ইতিমধ্যে বাজেট উইংয়ের কর্মচারী আব্দুর রউফকে অন্যত্র বদলি করা হয়। অন্যরাও বদলির প্রক্রিয়াধীন ছিলেন। এমন সময় যে কোনোভাবেই হউক, মন্ত্রী জেনে যান প্রকৃত তথ্য। ফলে বাজেট উইংয়ের কর্মকর্তারা শাস্তিমূলক বদলি থেকে বাঁচেন।

এদিকে সমস্যায় পড়ে ওই বিশেষ সিন্ডিকেটটি। কারণ, তারা ইতিমধ্যে বড় অংকের কমিশনের বিনিময়ে এই বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছেন। এখন তা আটকে দিয়েছেন মন্ত্রী। মন্ত্রীর পক্ষ থেকেও একই অংকের কমিশন চাওয়া হয় তাদের কাছে। কিন্তু এতো কমিশন দিতে গেলে ব্যবসা করা তো সম্ভব হবেই না, উল্টো পুঁজিতে টান পড়তে পারে। তাই তারা কিছুটা পিছটান দেয়। চেষ্টা করে মন্ত্রীর কমিশনের পরিমাণ কমিয়ে আনতে। তার পরিবারের এক সদস্য এবং এপিএসের সঙ্গে এ নিয়ে কয়েক দফায় বৈঠকও হয়। কোনো ফয়সালায় আসা যাচ্ছিলো না। তারই মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসের ১৮ তারিখ থেকে শুরু হয় দেশে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান। অভিযানে ধরা পড়ার ভয়ে ওই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটটি এক পর্যায়ে গা ঢাকা দিতে বাধ্য হয়। আর এতে মন্ত্রীর লোকেরাও বুঝতে পারে, এ অর্থবরাদ্দ বাতিল করা ছাড়া উপায় নেই। অবশেষে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ডেঙ্গু বিষয়ক এ বরাদ্দ বাতিল করা হয়।

উল্লেখ্য, এই টাকা বরাদ্দের সময়ই তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এম হাফিউদ্দিন খান সে সময় ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করায় টাকা বরাদ্দের উদ্যোগকে সমর্থন করেছিলেন, তবে একই সাথে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, দেশে দুঃসময়কে উছিলা করে দুর্নীতির অনেক নজির আছে।

এম হাফিজউদ্দিন খান জানতেন না, এ সময় আসলে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের কোনো প্রয়োজনই নেই। সে কারণেই তিনি ওই বরাদ্দকে সমর্থন করেছিলেন। কারণ, এমএসআরসহ প্রত্যেকটি খাতেই হাসপাতালগুলোর বাজেটের পুরো অর্থ মজুত রয়েছে। এ টাকা খরচ হবার পরই নতুন করে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া যেতে পারে। তবে হাফিজউদ্দিন খান লুটপাটের যে আশংকার কথা ব্যক্ত করেছিলেন সেটিই আদতে সত্য ছিল।

স্বাস্থ্যখাতে লুটপাটের কাহিনী কারো অজানা নয়। বিশেষ করে কেনাকাটায় নিয়মিত বরাদ্দেরই অধিকাংশ অর্থ লুটপাট হয়ে থাকে। অতিরিক্ত বরাদ্দ মানেই লুটপাটের মহাউৎসব। বিশেষ উপলক্ষ্য দেখা দিলে এই লুটপাটের সুযোগ আরো বেড়ে যায়। এখানে ডেঙ্গু ইস্যুটিকে ‘উপলক্ষ্য’ হিসেবে কাজে লাগিয়ে বড় অংকের অর্থ হাতিয়ে নিতে চেয়েছিল দুর্নীতিবাজচক্রটি। সংশ্লিষ্ট্ সূত্রমতে, এই সাড়ে ৩৬ কোটি টাকার প্রায় পুরোটাই লুটপাট হতো।

মন্ত্রী জাহিদ মালেক লুটপাট ঠেকানোর উদ্দেশ্যে যে তৎপর হয়েছেন তা নয়। বরং তার ভাগটা বাদ পড়ে যাচ্ছিলো তাই তিনি ক্ষেপে উঠেছিলেন। আড়াই মাস ধরে চেষ্টাও করেছেন সেই ভাগটা আদায় করার জন্য। এখন ডেঙ্গু বরাদ্দ বাতিল করায় সেই অর্থ যে ভবিষ্যতে সঠিক খাতে ব্যয় হবে সেই নিশ্চয়তাও নেই। কারণ, এমএসআর খাতের থোক বরাদ্দ এবং সাধারণ খাতের থোক বরাদ্দের অর্থগুলো যখন বিভিন্ন হাসপাতালকে বণ্টন করা হয় তখনই মন্ত্রীর কমিশনটা আদায় হয়ে যায়। এখন ডেঙ্গু বরাদ্দ বাতিলের মাধ্যমে সেই কমিশনটা নিশ্চিত করা গেলো। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, রুহুল হক এবং মোহাম্মদ নাসিমের কায়দায়ই চলছে এখনকার স্বাস্থ্যখাত।