ঢাকা, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬,
সময়: ১২:৪৩:৪৩ AM

জাহাঙ্গীরনগরে ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীকে ‘ধর্ষণচেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক | জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
14-05-2026 06:53:46 AM
জাহাঙ্গীরনগরে ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীকে ‘ধর্ষণচেষ্টা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাসে এক নারী শিক্ষার্থীকে শ্বাসরোধ করে টেনে-হিঁচড়ে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে ‘ধর্ষণচেষ্টার’ এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রাত সোয়া এগারোটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আল বেরুনী এক্সটেনশনের পরিত্যক্ত ভবন ও পুরাতন ফজিলাতুন্নেসা হল সংলগ্ন রাস্তায় এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে।

ঘটনার বিবরণ

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ এক দুর্বৃত্ত তাঁর গলায় নেট পেঁচিয়ে ধরে। এরপর অত্যন্ত নৃশংসভাবে তাঁকে টেনে পাশের একটি অন্ধকার ও নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। প্রায় দেড় থেকে দুই মিনিট ধরে ওই শিক্ষার্থী প্রাণের ভয়ে হামলাকারীর সাথে ধস্তাধস্তি করেন। তাঁর বলিষ্ঠ প্রতিরোধ এবং শেষ মুহূর্তে চিৎকার শুনে রাস্তা দিয়ে যাওয়া অন্য শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এলে হামলাকারী পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

শিক্ষার্থীরা জানান, ভিক্টিম যদি অসীম সাহসিকতার সাথে মোকাবিলা না করতেন এবং পথচারীরা সময়মতো না পৌঁছাতেন, তবে ক্যাম্পাস এক ভয়াবহ ও কলঙ্কজনক ঘটনার সাক্ষী হতো।

উদ্ধারকৃত আলামত ও পুলিশি ব্যবস্থা

ঘটনাস্থল থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তির এক জোড়া জুতা এবং গলায় পেঁচানোর কাজে ব্যবহৃত নেটটি উদ্ধার করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে অভিযুক্তের চেহারা শনাক্ত করা গেছে। ঘটনার পরপরই আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তায় একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে যে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হবে।

প্রশাসনের নির্লজ্জ উদাসীনতা ও জাকসুর প্রতিক্রিয়া

দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসের ভঙ্গুর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। এই বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)-এর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অবহেলাই এই ঘটনার মূল কারণ।

নিরাপত্তা ত্রুটির প্রধান দিকগুলো হলো:

  • নিরাপত্তা কর্মী সংকট: বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা শাখায় বর্তমানে প্রায় ৫০% জনবল ঘাটতি রয়েছে, যা পূরণে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

  • বহিরাগত নিয়ন্ত্রণহীনতা: ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ এবং যাতায়াত অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে।

  • অন্ধকার এলাকা: গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও ভবনের পাশে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে নির্জন স্থানগুলো।

  • পূর্ববর্তী ঘটনার বিচারহীনতা: অতীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন হেনস্থার ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে উঠছে।

জাকসুর হুঁশিয়ারি ও আল্টিমেটাম

জাকসু জিএস এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছেন, "প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি নির্লজ্জভাবে অগুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা সংস্কার ও জনবল বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসলেও তার কোনো সুরাহা হয়নি।"

ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে অবিলম্বে দুটি দাবি জানানো হয়েছে:

  1. ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেপ্তার: সিসিটিভি ফুটেজ ও আলামতের ভিত্তিতে আগামীকালের মধ্যে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

  2. নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কার: ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আমূল বদলে ফেলে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, অনতিবিলম্বে অপরাধীকে আটক এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে 'প্রশাসনিক অচলাবস্থা' তৈরি করা হবে।

ক্যাম্পাসের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখন প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি জায়গায় নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এভাবে বিঘ্নিত হওয়াকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য চরম লজ্জাজনক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।