খুলনা-৫ (ফুলতলা–ডুমুরিয়া) আসনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে উত্তাপ। দীর্ঘদিন পর এ আসনে জমে উঠেছে ত্রিমুখী রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে তিনি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন এবং বিজয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এলাকায় সরেজমিনে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সংগঠন পুনর্গঠন এবং ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে গোলাম পরওয়ার ভোটারদের একটি বড় অংশের আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন। ফুলতলার ভোটার রহমত আলী বলেন,“গোলাম পরওয়ার একজন শিক্ষিত ও জনপ্রিয় নেতা। এলাকায় তার গ্রহণযোগ্যতা আছে। বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে, তবে এবার জয়ের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করি।”
১৭ বছরের দমন-পীড়নেও টিকে থাকা নেতা
গত প্রায় ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মামলা, কারাবরণ ও নানা চাপের মধ্যেও গোলাম পরওয়ার রাজনৈতিক মাঠ ছাড়েননি। স্থানীয় জামায়াত নেতাদের দাবি, এ সময় তিনি শুধু নিজেকে টিকিয়ে রাখেননি, বরং বিপর্যস্ত দল জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক ভিত শক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, সরকারবিরোধী রাজনীতির কারণে তিনি একাধিকবার গ্রেফতার হন, দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকেন এবং নিয়মিত নজরদারির মধ্যে ছিলেন। ২০১০ সালের ৩০ জুন খুলনায় একটি মিছিল থেকে গ্রেফতার হয়ে টানা পাঁচ বছর কারাভোগ করেন। এরপরও বিভিন্ন সময়ে তিন থেকে চার দফা কারান্তরীণ হন। তবুও রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে যাননি বলে দাবি করেন তার সমর্থকেরা।
রাজনৈতিক পরিচয় ও উত্থানের পথ
মিয়া গোলাম পরওয়ার জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর, খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার শিরোমণি গ্রামে। শিক্ষাজীবনে তিনি খুলনার বি.এল. কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিকম ও এম কম ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষে স্থানীয় একটি কলেজে শিক্ষকতা করেন এবং একই সঙ্গে সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে। ১৯৭৪ সালে তিনি জাসদ ছাত্রলীগে যোগ দিয়ে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে ছাত্র থাকাকালীন জামায়াতের সহযোগী ছাত্র সংগঠনে যুক্ত হন। পর্যায়ক্রমে তিনি ছাত্রশিবিরের খুলনা মহানগর সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি খুলনা মহানগর জামায়াতের আমীর ছিলেন। পরে ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালের নভেম্বরে তিনি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর হিসেবে মনোনীত হন এবং ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে তিনি দলের সেক্রেটারি জেনারেল। পাশাপাশি বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
নির্বাচনী ইতিহাস ও খুলনা-৫ আসন
গোলাম পরওয়ারের রাজনৈতিক জীবনে খুলনা-৫ আসন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে খুলনা-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে একই আসনে তিনি ১৯৯১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিশ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, কিন্তু সেবারও বিজয়ী হতে পারেননি।
এবারের নির্বাচনকে তার রাজনৈতিক জীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ বিরতির পর মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতি এবং সংগঠনের পুনরুজ্জীবন তাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
মাঠের রাজনীতি ও ভোটারদের মনোভাব
ফুলতলা ও ডুমুরিয়া এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, জামায়াতের নেতাকর্মীরা নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয়। গ্রাম থেকে বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে চলছে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ। স্থানীয় অনেক ভোটারের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকলেও গোলাম পরওয়ার এলাকায় নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন।
ডুমুরিয়ার এক ভোটার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“অনেক নেতা নির্বাচনের সময় ছাড়া এলাকায় আসেন না। কিন্তু গোলাম পরওয়ারকে আমরা সংকটের সময়ও দেখেছি। মানুষ এটাকে মূল্যায়ন করে।”তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে হাড্ডাহাড্ডি। জাতীয় রাজনীতির সমীকরণ, ভোটার উপস্থিতি এবং শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখবে।
বিতর্কিত বক্তব্য ও রাজনৈতিক সমালোচনা
মিয়া গোলাম পরওয়ারের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে বিতর্কও জড়িয়ে আছে। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক আলোচনাসভায় তিনি দাবি করেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী নয়, বরং ভারতীয়রা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল।
তিনি ওই আলোচনায় বলেন,“বামপন্থি ও কলকাতাকেন্দ্রিক কিছু বুদ্ধিজীবী এবং ভারতপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের জন্য জামায়াতে ইসলামীর নাম জড়িয়ে আসছেন। তবে ইতিহাসের নানা তথ্য ও সত্য সামনে আসায় প্রমাণ হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ড ভারতীয় সেনা ও গোয়েন্দাদের সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল।”
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কী বলছেন বিশ্লেষকরা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খুলনা-৫ আসনের নির্বাচন শুধু ব্যক্তি গোলাম পরওয়ারের নয়, বরং জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ দলটির জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
বিশ্লেষক অধ্যাপক একরামুল হক বলেন,
“গোলাম পরওয়ারের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং অতীত সাংসদ হিসেবে পরিচিতি আছে। তবে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব, ভোটের পরিবেশ ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলের কৌশল ফলাফলে নির্ধারক ভূমিকা রাখবে।” সব মিলিয়ে খুলনা-৫ আসনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সমর্থকদের দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে মাঠে নেমেছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বিজয়ী হবেন নাকি আবারও পরাজয়ের মুখ দেখবেন—সে উত্তর দেবে ভোটের দিনই। তবে এটুকু নিশ্চিত, খুলনা-৫ আসনের নির্বাচন এবারের জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিতে যাচ্ছে।