ঢাকা–১২ আসনের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজধানীর রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন–সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতা, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহল। দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও, এলাকাবাসী ও তৃণমূল কর্মীদের বড় একটি অংশের সমর্থন নিয়ে তিনি নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সরেজমিনে ঢাকা–১২ আসনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাইফুল আলম নীরবের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ও আস্থার জায়গা এখনও অটুট। দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক নির্যাতন, জেল-জুলুম ও আত্মগোপনের জীবন তার রাজনৈতিক পরিচয়কে আরও দৃঢ় করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
নির্যাতনের দীর্ঘ অধ্যায়
দলীয় ও পারিবারিক সূত্র জানায়, গত ১৭ বছরে সাইফুল আলম নীরবকে নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। মামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক এবং নজরদারির কারণে তিনি নিজের বাসায় বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ৩৬০ দিনই যেতে পারেননি। জীবনের অধিকাংশ রাত তাকে কাটাতে হয়েছে আত্মগোপনে।
একাধিক নেতাকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে তিনি শুধু ব্যক্তিগতভাবে নির্যাতনের শিকার হননি, বরং তার পরিবারও নানা চাপের মধ্যে দিন কাটিয়েছে। তবুও রাজপথের আন্দোলন থেকে তিনি নিজেকে সরিয়ে নেননি। বরং সংকটের সময় দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
ঢাকা–১২ আসনের এক প্রবীণ বিএনপি সমর্থক বলেন,
“নীরব ভাইয়ের মতো নেতারা সহজে ভেঙে পড়েন না। ১৭ বছর ধরে তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা সাধারণ মানুষ ভুলে যায়নি।”
মেধাবী ও চৌকশ যুব নেতা
সাইফুল আলম নীরবকে ঢাকার রাজনীতিতে একজন মেধাবী, চৌকশ ও সাংগঠনিক দক্ষ নেতা হিসেবেই চেনেন সহকর্মীরা। ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে এসে মহানগর রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। আন্দোলন, মিছিল ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয় উপস্থিতি তাকে দলের ভেতরে দ্রুত পরিচিত করে তোলে।
দলীয় নেতারা বলছেন, কঠিন সময়েও তিনি কর্মীদের পাশে থেকেছেন। গ্রেপ্তার আতঙ্ক উপেক্ষা করে মাঠে সক্রিয় থাকা এবং আন্দোলনের সময় নেতৃত্ব দেওয়া—এসব কারণে তৃণমূলের কাছে তিনি একজন আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
একজন স্থানীয় যুবক বলেন,
“নীরব ভাই শুধু নেতা নন, তিনি আমাদের একজন অভিভাবক। বিপদের সময় আমরা তাকে কাছেই পেয়েছি।”
দল থেকে বহিষ্কার ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন
রাজনৈতিক বাস্তবতায় নাটকীয় মোড় আসে যখন দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবকে বহিষ্কার করে বিএনপি। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ঢাকা–১২ আসনের জন্য প্রথমে বিএনপি তাকেই প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জোটগত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয় বিএনপির শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের জন্য। এই সিদ্ধান্তে এলাকাভিত্তিক বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
স্থানীয় নেতাদের দাবি, তৃণমূলের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় সাইফুল আলম নীরব স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন, যা নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও শক্ত অবস্থান
দলীয় বহিষ্কার সত্ত্বেও সাইফুল আলম নীরবের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ভাটা পড়েনি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বরং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তার প্রার্থিতা এলাকাবাসীর মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।
ঢাকা–১২ আসনের একাধিক সাধারণ ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত ত্যাগ, সততা ও এলাকার প্রতি দায়বদ্ধতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
একজন দোকানি বলেন,
“দল যেই হোক, আমরা মানুষটা দেখি। নীরব ভাই বিপদের সময় আমাদের পাশে ছিলেন। এবার ভোটটা তাকেই দেব।”
খেটে খাওয়া মানুষের সমর্থন
বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে সাইফুল আলম নীরবের সমর্থন। শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুরদের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে। আন্দোলনের সময় রাজপথে তাদের পাশে থাকার কারণে এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।
একজন রিকশাচালক বলেন,
“তিনি আমাদের কষ্ট বোঝেন। বড় বড় নেতা আসেন শুধু ভোটের সময়, কিন্তু নীরব ভাইকে আমরা সব সময় পেয়েছি।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সমর্থন ভোটের হিসাবে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
দলের অবদান ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন
বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সাইফুল আলম নীরবের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন অনেক সিনিয়র নেতা। দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা, নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা এবং কঠিন সময়ে মাঠে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়গুলো দলীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
একজন সাবেক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“দল হয়তো শৃঙ্খলার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু নীরবের ত্যাগ দল কখনও ভুলতে পারবে না।”
ভোটের সমীকরণ ও সম্ভাবনা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা–১২ আসনের নির্বাচন এবার বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে। দলীয় প্রার্থী, জোট প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ত্রিমুখী লড়াইয়ে ফলাফল নির্ভর করবে ভোটার উপস্থিতি, শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক কৌশল এবং জনমতের ওপর।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সাইফুল আলম নীরব এই নির্বাচনে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন। দলীয় পরিচয় না থাকলেও তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ তাকে ভোটের মাঠে এগিয়ে রেখেছে।
সব মিলিয়ে ঢাকা–১২ আসনের নির্বাচন শুধু একটি আসনের লড়াই নয়, বরং রাজনীতিতে ব্যক্তি বনাম দলীয় সিদ্ধান্তের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ১৭ বছরের নির্যাতন, আত্মগোপনের জীবন ও রাজপথের লড়াই পেরিয়ে সাইফুল আলম নীরব আজও সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে আছেন।
তিনি বিজয়ী হবেন কিনা—সে সিদ্ধান্ত নেবে ভোটের বাক্স। তবে এটুকু নিশ্চিত, ঢাকা–১২ আসনের এই নির্বাচন রাজধানীর রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচিত হয়ে থাকবে।