আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই উত্তাপ ছড়াচ্ছে। খেলাপি ঋণ ও দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ, রাজনৈতিক দলগুলোর ভাঙন, নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্ক, সহিংসতার ঘটনা, ভোটার স্থানান্তর, ব্যালট পেপারে প্রতীক বরাদ্দসংক্রান্ত জটিলতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মতো নানা বিষয় মিলিয়ে সার্বিকভাবে একটি অনিশ্চিত ও উদ্বেগজনক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন মহল আশঙ্কা করছেন, এসব সমস্যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে আসন্ন নির্বাচন একটি বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।
রাজনৈতিক বিভাজন ও দলীয় ভাঙন
নির্বাচনের প্রাক্কালে সম্প্রতি একাদশ রাজনৈতিক দলের ভাঙন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং নির্বাচনী কৌশল নিয়ে মতবিরোধের কারণে এই ভাঙন ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিভাজন শুধু সংশ্লিষ্ট দলগুলোকেই দুর্বল করছে না, বরং সার্বিক রাজনৈতিক ভারসাম্যকেও নড়বড়ে করে তুলছে।
একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ ও দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে একাধিক প্রার্থীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়ে বিরোধী পক্ষ ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন আপত্তি তুলছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি না হলে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্ক ও উত্তেজনা
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন ভবনে আব্দুল্লাহ ইউয়াল মিন্টু ও হাসনাত আবদুল্লাহর মধ্যে প্রকাশ্য তর্ক-বিতর্ক রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় কমিশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ‘শাসনতন্ত্র আন্দোলন’-এর নেতা আমির রেজাউল করিমের জামায়াতে ইসলামি প্রসঙ্গে দেওয়া বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়েছে, যা নির্বাচনী পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
নির্বাচনকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে মারামারি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। কোথাও কোথাও এসব সংঘর্ষে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে অভিযোগ উঠছে।
বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রমে গাফলতির অভিযোগ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের সময় অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি বড় ধরনের সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তারা অবিলম্বে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ভোটার স্থানান্তর ও নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন
নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। লক্ষ লক্ষ ভোটার স্থানান্তরের ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্বচ্ছতা ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই ভোটার স্থানান্তর করা হচ্ছে, যা ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া ব্যালট পেপারে বরাদ্দকৃত প্রতীকের সেটআপ ও কারিগরি ত্রুটি নিয়েও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রতীক ভুলভাবে ছাপা, প্রতীকের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি এবং ব্যালট পেপারের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে ভোট গ্রহণের দিন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।
ছাত্রদলের কর্মসূচি ও রাজনৈতিক চাপ
এদিকে বিরোধী দলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন অফিস ঘেরাও কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে এবং সরকারদলীয় প্রার্থীদের সুবিধা দিচ্ছে।
ছাত্রদলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কাও তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রাজনীতির মাঠে নতুন মাত্রা যোগ করলেও তা যদি সহিংস রূপ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশিষ্টজনদের উদ্বেগ ও আহ্বান
বিশিষ্ট নাগরিক, সাবেক নির্বাচন কমিশনার, আইন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি নির্বাচনকে ঘিরে এক ধরনের অরাজকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তারা অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিতকরণ এবং সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপের ওপর জোর দিয়েছেন।
তাদের মতে, নির্বাচনী পরিবেশ শান্ত ও গ্রহণযোগ্য রাখতে হলে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। অন্যথায় নির্বাচন নিয়ে জনমনে আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।
গণতন্ত্র ও নির্বাচনের ভবিষ্যৎ
বিশ্লেষকদের মতে, একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার মূল শর্ত। বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে শুধু আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়, সামগ্রিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এক চরম সংবেদনশীল সময় পার করছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে নির্বাচন নিয়ে অস্থিরতা ও বিতর্ক দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। এখন দেখার বিষয়, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে এবং জাতিকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে নিয়ে যেতে পারে।