আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং নাগরিক অধিকার পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করছে। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, মানুষের সমস্যা চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধান দেওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা—এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিএনপি তাদের ঘোষিত ‘৩১ দফা’ কর্মসূচিকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপরিচালনার রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরছে।
বিএনপির দাবি, এই ৩১ দফার মধ্য দিয়েই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্বপ্নের পূর্ণতা দিতে চান তারেক রহমান। দলীয় নেতারা বলছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান আজ একটি পরিণত ও বাস্তববাদী রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে সামনে এগোচ্ছেন।
প্রবাসে থেকেও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে যেসব নেতা দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থেকেও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তাদের মধ্যে তারেক রহমান অন্যতম। এক যুগেরও বেশি সময় যুক্তরাজ্যে অবস্থান করলেও বিএনপির দলীয় রাজনীতি, আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ এবং নীতিগত সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন সক্রিয় ও প্রভাবশালী।
২০২৫ সালের শেষ দিকে তাঁর দেশে প্রত্যাবর্তন এবং ২০২৬ সালের শুরুতে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ দলটির রাজনীতিতে শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, বরং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপি দীর্ঘদিন পর পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব কাঠামোতে ফিরে আসে, যা দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।
পারিবারিক পরিচয় ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
তারেক রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। তিনি স্বাধীনতার ঘোষক, সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান। স্বাধীনতার ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা একটি পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা।
রাজনীতি তাঁর জীবনে স্বাভাবিক এক উত্তরাধিকার হলেও, শুধুমাত্র পারিবারিক পরিচয়ের ওপর ভর করে নয়—ব্যক্তিগত সংগঠকসত্তা, রাজনৈতিক অধ্যবসায় এবং দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন বলে মনে করেন বিএনপির নেতারা। সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ধাপে ধাপে নেতৃত্বের শীর্ষে পৌঁছান তিনি।
শিক্ষা ও প্রারম্ভিক জীবন
ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে তারেক রহমানের শিক্ষাজীবনের সূচনা। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। যদিও স্নাতক পর্যায় সম্পন্ন করার আগেই তিনি পড়াশোনা থেকে সরে এসে বস্ত্র ও নৌ-যোগাযোগ খাতে ব্যবসায় যুক্ত হন, তবে রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর আগ্রহ অব্যাহত থাকে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি, উন্নয়ন দর্শন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার মডেল নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত অধ্যয়ন ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চিন্তাকে সমৃদ্ধ করে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অধ্যয়নই পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আধুনিকতা ও কৌশলগত চিন্তার ছাপ ফেলে।
রাজনীতিতে সক্রিয় পদচারণা
নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই তারেক রহমানের রাজনৈতিক সক্রিয়তা দৃশ্যমান হতে থাকে। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মাতা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেশব্যাপী নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন। ওই সময় থেকেই মাঠপর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠে।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর ভূমিকা আরও সুসংগঠিত ও কৌশলগত হয়ে ওঠে। এই নির্বাচনের পর বিএনপির অভ্যন্তরে তিনি একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ব্যাপক আলোচিত হয়।
২০০২ সালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি দেশজুড়ে গণসংযোগ জোরদার করেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়, সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম তদারকি এবং সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের মাধ্যমে তিনি দলের তরুণ অংশের মধ্যে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন।
মামলা, বিতর্ক ও প্রবাস জীবন
২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারেক রহমান গ্রেপ্তার হন এবং একাধিক মামলার মুখোমুখি হন। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তাঁকে দণ্ডিত করা হয়। বিএনপি এসব মামলাকে শুরু থেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে।
কারাবন্দি অবস্থায় তাঁর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ দেশ-বিদেশে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে যান এবং দীর্ঘ সময় সেখানেই অবস্থান করেন। এই প্রবাসজীবন অনেকের কাছে ‘নির্বাসন’ হিসেবে বিবেচিত হলেও, বাস্তবে তিনি দলীয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না।
প্রবাসে অবস্থান করেই তিনি আধুনিক রাজনৈতিক কৌশল, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং প্রবাসী নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে বিএনপির কর্মকাণ্ডকে নতুন মাত্রা দেন বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের আন্দোলনে ভূমিকা
২০২৪ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তারেক রহমান সরাসরি মাঠে উপস্থিত না থাকলেও কৌশলগত ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ছিলেন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ভার্চুয়াল বৈঠক, ভিডিও বার্তা ও দলীয় নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি আন্দোলনের রূপরেখা নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।
তাঁর বক্তব্যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, জনসম্পৃক্ততা এবং আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সংকটকালে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম একজন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হিসেবে তিনি নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।
ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ও নেতৃত্ব গ্রহণ
২০২৪ সালে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তনের পর আদালতের রায়ে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হয়। ফলে তাঁর দেশে ফেরার পথ উন্মুক্ত হয়।
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে দেশে ফেরেন। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তাঁকে স্বাগত জানাতে নেতাকর্মীদের ঢল নামে।
২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দলীয় নেতারা বলছেন, এই দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিএনপি নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়তা
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তারেক রহমান নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৭ এবং বগুড়ার একটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন। এই অল্প সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
তাঁর বক্তব্যে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, তাঁর ভাষা ও উপস্থাপনায় আগের তুলনায় পরিমিতি ও রাজনৈতিক পরিপক্বতা স্পষ্ট।
ব্যক্তিজীবন
১৯৯৪ সালে তারেক রহমান ডা. জোবায়দা রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ডা. জোবায়দা রহমান একজন চিকিৎসক এবং সাবেক নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কন্যা। তাঁদের একমাত্র কন্যা জাইমা রহমান।
দীর্ঘ প্রবাসজীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রামে পরিবারই ছিল তাঁর প্রধান শক্তির উৎস।
তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে সমর্থকদের কাছে নেতৃত্বের প্রতীক । তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, প্রবাস জীবন এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।
বিএনপির পুনর্গঠন, ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ—এই তিন ধারার সাফল্যই নির্ধারণ করবে তাঁর নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ। তবে তাঁর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচিত হয়েছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে খুব কমই দ্বিমত রয়েছে।