ঢাকা, রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৩:০৯:১৪ AM

প্রেমের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
01-08-2026 12:54:41 PM
প্রেমের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

খেলনা নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করার যে বয়স, সেই বয়সেই জুঁইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল সংসারের ভার। ফেসবুকে পরিচয়, তারপর প্রেম, আর সেই প্রেমের পরিণতি বিয়ে। কিন্তু তখনও সে ছিল শিশু—মাত্র ১১ বছরের এক কিশোরী। তার স্বামী শাকিল ওরফে শাকিব মিয়ার বয়স তখন ২২ বছর। দুই বছরের মাথায়, মাত্র ১৩ বছর বয়সেই জুঁই জন্ম দেয় এক পুত্রসন্তানের। মাতৃত্বের আনন্দে ভেসে ওঠার আগেই তার জীবনে নেমে আসে আরেক নির্মম অধ্যায়।

শিশুটির বয়স যখন মাত্র সাড়ে চার মাস, তখন তাকে মায়ের বুক থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, জুঁইকে শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়, কিন্তু তার সন্তানকে রেখে দেওয়া হয় সেখানে। একদিকে শৈশব হারানোর বেদনা, অন্যদিকে সন্তানের বিচ্ছেদ—দুই কষ্ট নিয়েই শুরু হয় এক কিশোরী মায়ের অসহায় সংগ্রাম।

অসহায় হলেও জুঁই হার মানেনি। সন্তানের মুখ আবার দেখার আকাঙ্ক্ষা তাকে আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করে। বুকভরা কান্না, অসীম অপেক্ষা আর আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে তার জীবনে আসে স্বস্তির খবর। প্রায় আড়াই মাসের আইনি লড়াইয়ের পর আদালতের নির্দেশে সে ফিরে পায় তার আদরের সন্তানকে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ঢাকার চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সিভিল জজ মো. সায়েম খান উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে শিশুটিকে আপাতত মায়ের জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের এই আদেশ যেন জুঁইয়ের জীবনে নতুন করে আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন পর সন্তানের স্পর্শ ফিরে পেয়ে এক কিশোরী মায়ের চোখে ফুটে ওঠে স্বস্তি আর অশ্রুমিশ্রিত আনন্দ।

জুঁইয়ের অভিযোগ, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তাকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর তাকে বিভিন্ন সময় নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। সন্তান জন্মের পরও তার জীবনে শান্তি আসেনি। বরং শেষ পর্যন্ত তাকে সন্তান ছাড়া ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য তার আর কোনো পথ খোলা ছিল না, তাই আইনের আশ্রয় নেন তিনি।

অন্যদিকে শাকিলের দাবি, জুঁই নিজের ইচ্ছাতেই তার সঙ্গে গিয়েছিল। তিনি আরও দাবি করেন, জুঁই স্বেচ্ছায় সন্তানকে রেখে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। পরবর্তীতে শিশুর অভিভাবকত্ব চেয়ে তিনি পারিবারিক আদালতেও মামলা করেন।

গত ১ জুলাই জুঁই ঢাকার লিগ্যাল এইড অফিসে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে শাকিল ও তার মাকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তারা উপস্থিত হননি। পরে বিচারক শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য চকবাজার থানাকে নির্দেশ দেন। সোমবার পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে আদালতে হাজির করে। পরদিন শুনানি শেষে মানবিক বিবেচনায় শিশুটিকে মায়ের জিম্মায় দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৪ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়েছে।

শুনানির সময় বিচারকও ঘটনাটির মানবিক দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “প্রথম দিন জুঁইকে দেখে বিশ্বাসই হয়নি, তার একটি সন্তান রয়েছে। কারণ, জুঁই নিজেও তো একটি শিশু।” বিচারকের এই মন্তব্য যেন পুরো ঘটনার গভীর বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে।

জুঁইয়ের জীবনের গল্প শুধু একটি পারিবারিক বিরোধের ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে একটি শিশু বয়সেই আরেকটি শিশুর মা হয়ে যায়, যেখানে শৈশবের জায়গা দখল করে নেয় সংসারের দায়িত্ব, মাতৃত্বের কষ্ট আর আইনি লড়াই।

এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তোলে—একজন ১১ বছরের শিশুর হাতে কেন সংসারের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে? কেন একটি কিশোরীকে তার শৈশব হারিয়ে মাতৃত্বের ভার বহন করতে হবে? আর কেন জন্মের পর থেকেই একটি নিষ্পাপ শিশুকে দেখতে হবে বিচ্ছেদ, আদালত আর আইনের কঠিন বাস্তবতা?

জুঁই আজ আপাতত তার সন্তানকে ফিরে পেয়েছে। কিন্তু তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন এবং মানসিক ক্ষতের হিসাব কে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি আদালতের রায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এর উত্তর খুঁজে বের করা সমাজ, পরিবার এবং রাষ্ট্র—সবার দায়িত্ব।