ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৩:৫৯:০৬ AM

রেড ক্রিসেন্টে অনির্বাচিত কমিটি, নিয়োগকে ঘিরে প্রশ্ন

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
20-09-2026 07:35:33 PM
রেড ক্রিসেন্টে অনির্বাচিত কমিটি, নিয়োগকে ঘিরে প্রশ্ন

নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে থাকলেও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে অনির্বাচিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে মহাসচিব ও উপ-মহাসচিব নিয়োগে নিয়মনীতি অনুসরণ না করার অভিযোগও সামনে এসেছে। চলমান অ্যাডহক কমিটির মূল দায়িত্ব ছিল পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন আয়োজন করা। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় শেষ পর্যন্ত তা স্থগিত করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উদ্বেগ ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ব্যবস্থাপনা পর্ষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে ২০২৪-২০২৬ মেয়াদের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ গঠিত হয়। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই পর্ষদের কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জন্য একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করে।

নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর জেনারেল (অব.) মো. রফিকুল ইসলামকে। একই সঙ্গে সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. কবির মো. আশরাফ আলমকে মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

রেড ক্রিসেন্টের বিধান অনুযায়ী, বিশেষ পরিস্থিতিতে অ্যাডহক ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা পর্ষদ গঠনের সুযোগ রয়েছে। তবে এর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচিত ব্যবস্থাপনা পর্ষদ গঠনের জন্য নির্বাচন আয়োজন করা। অভিযোগ রয়েছে, অ্যাডহক কমিটি সেই দায়িত্ব যথাসময়ে সম্পন্ন করতে পারেনি। চেয়ারম্যানসহ ব্যবস্থাপনা পর্ষদ কয়েক দফায় গঠন ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে গেলেও নির্বাচন নিয়ে স্থায়ী সমাধান হয়নি।

মহাসচিব-উপ-মহাসচিব নিয়োগে প্রশ্ন
মহাসচিব ও উপ-মহাসচিব নিয়োগ নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৮ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল (ডিএসজি) পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। বিজ্ঞপ্তির পর আবেদনকারীদের মধ্য থেকে আটজনকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। ১৫ জুলাই তাদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও পরবর্তীতে ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, ওই আট প্রার্থীর বাইরে থেকে এহসান-ই-এলাহী নামের একজনকে ১২ আগস্ট ডিএসজি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আবেদন বা পরীক্ষায় অংশ নেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। আরও অভিযোগ, ১২ আগস্ট আবেদন জমা দিয়ে একই দিন নিয়োগপত্র গ্রহণ ও চাকরিতে যোগদান করেন তিনি।

এর পরদিন, ১৩ আগস্ট হাবিবুর রহমান খানকে সেক্রেটারি জেনারেল (এসজি) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়োগের ক্ষেত্রেও কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

দুই নিয়োগকে অনুমোদন দিতে ১৩ আগস্ট নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত মহাসচিব বোর্ড সভা আহ্বান করেন। ১৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় তাদের নিয়োগ অনুমোদন করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সভায় তাদের নিয়োগের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বোর্ড সদস্যদের কাছে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে বোর্ড সদস্য অ্যাডভোকেট এস এম মাহিদুল ইসলাম সজীব নোট অব ডিসেন্ট দেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেননি।

কে এই এহসান-ই-এলাহী?
উপ-মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এহসান-ই-এলাহী একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।

সরকারের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে ২০১৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। এরপর ২১ জানুয়ারি থেকে ২৪ জুন ২০২১ পর্যন্ত বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২৯ জুন থেকে ১৭ আগস্ট ২০২১ পর্যন্ত ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন।

২০২১ সালের ১৭ আগস্ট তিনি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওই পদে ছিলেন। সাধারণ চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তৎকালীন সরকার তাকে আরও ছয় মাসের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মহাসচিব হাবিবুর রহমান খান
হাবিবুর রহমান খান বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ক্যাডারের সাবেক কর্মকর্তা। প্রায় ৩৩ বছরের সরকারি চাকরি জীবনে তিনি জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে মিনিস্টার (কমার্শিয়াল) ও কাউন্সেলর (কমার্শিয়াল) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) এবং করোনা-সংক্রান্ত মিডিয়া সেলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২০ সালের জুনে তাকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (বারটান) নির্বাহী পরিচালক পদে বদলি করা হয়। ওই পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সরকারি চাকরির বয়সসীমা পূর্ণ করে অবসরে যান। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট হিসেবেও কাজ করেন। এরপর রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মহাসচিবের দায়িত্ব পান।

নির্বাচন ঘিরে যত অভিযোগ
গত ১৬ আগস্ট রেড ক্রিসেন্টের বোর্ড সভায় ব্যবস্থাপনা পর্ষদের নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। সভায় ভাইস চেয়ারম্যান, ট্রেজারার ও সদস্য কাজী মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচন কমিশন গঠনের দায়িত্ব মহাসচিব ও উপ-মহাসচিবকে দেওয়া হয়।

সভায় জানানো হয়, রেড ক্রিসেন্টের ৬৮টি ইউনিটের মধ্যে ৩০টির কমিটি গঠিত হয়েছে। বাকি ৩৮টি ইউনিট থেকে অ্যাডহক কমিটি তাদের প্রতিনিধি মনোনয়ন দিয়ে পাঠাতে পারবে।

এরপর নির্বাচন কমিশন গঠনসহ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম, ঝালকাঠিসহ বিভিন্ন ইউনিটের প্রতিনিধি মনোনয়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ভোটার হওয়ার যোগ্য নন—এমন ব্যক্তিকে ভোটার করা এবং যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দেওয়ার অভিযোগও আসে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনি নোটিশও দেওয়া হয়।

পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অংশীদার ও দাতা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানানো হয় বলে রেড ক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১০ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় বিশেষ সাধারণ সভাও বাতিল করা হয়।

চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. আব্দুস সালামের স্বাক্ষর করা চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন ইউনিট থেকে পাওয়া অ্যাডহক কমিটির ডেলিগেটদের বৈধতা, নির্বাচিত কমিটি থেকে ডেলিগেট মনোনয়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উদ্বেগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ, আইনগত সামঞ্জস্য ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আরও সময় প্রয়োজন।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
রেড ক্রিসেন্টের বর্তমান বোর্ড গঠন ও নিয়োগের সময় স্বাস্থ্য সচিব ছিলেন কামরুজ্জামান চৌধুরী। সে সময় তিনি বলেন, সরকারের মেয়াদে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একবারই কমিটি করে দিয়েছে এবং ওই কমিটির দায়িত্ব ছিল নির্বাচিত কমিটি গঠনের কাজ সম্পন্ন করা। আগের কমিটি গঠন নিয়ে মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য নেই বলেও জানান তিনি।

নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, নিয়োগ রেড ক্রিসেন্টের নিজস্ব বিষয়। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব নিয়মে চলে এবং এটি একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। ফলে এসব বিষয়ে রেড ক্রিসেন্ট কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে।

বর্তমান স্বাস্থ্য সচিব ড. আ ন ম বজলুর রশীদের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি নতুন দায়িত্বে এসেছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তবে অভিযোগগুলো খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে, রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. আব্দুস সালামের বক্তব্য জানতে গত দুই সপ্তাহ ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার দপ্তরে চেয়ারম্যানের অনুমোদন ছাড়া প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়নি। মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

ফলে নিয়োগ ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে রেড ক্রিসেন্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি। এখন মূল প্রশ্ন হলো—অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি করে কত দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য ও নিয়মসম্মত নির্বাচনের মাধ্যমে রেড ক্রিসেন্টের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ গঠন করা সম্ভব হয়।