ঢাকা, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:৪৫:৪০ PM

প্রধানমন্ত্রীর অপচয় ও দুর্নীতি রোধে কঠোর

মান্নান মারুফ
10-06-2026 12:45:40 PM
প্রধানমন্ত্রীর অপচয় ও দুর্নীতি রোধে কঠোর

বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন, নতুন নামফলক স্থাপন, বিদেশ ভ্রমণভিত্তিক প্রশিক্ষণ, অপ্রয়োজনীয় কর্মশালা এবং বাস্তব ফলাফলহীন নানা ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। এসব খাতে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি অর্থের অপচয় কমানো, ব্যক্তি-কেন্দ্রিক নামকরণ সংস্কৃতি নিরুৎসাহিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সীমিত করার বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্য ও উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় তদারকি বৃদ্ধির ধারণাও গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেকের মতে, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্র প্রতি অর্থবছরে প্রায় ৬০০০০ থেকে ৭০০০০ কোটি টাকার বেশি অপচয় ও অনিয়ম থেকে রক্ষা পেতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ অভিযোগ ছিল যে, প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক সময় বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্প যেমন রাস্তা, কালভার্ট, সেতু বা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সব সময় বাস্তব চাহিদা ও উপযোগিতা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি বলে সমালোচকরা দাবি করে থাকেন।

অতীতে অনেক সংসদ সদস্য তাদের নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নের জন্য একাধিক প্রকল্পের অনুমোদন ও বরাদ্দ সংগ্রহ করতেন। তবে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে যে, কিছু প্রকল্প বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ছিল অথবা সেগুলোর ব্যয় ও মান নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কোথাও কোথাও রাস্তার তুলনায় কালভার্টের সংখ্যা বেশি, আবার কোথাও জনসাধারণের ব্যবহার সীমিত এমন অবকাঠামো নির্মাণের উদাহরণও আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনায় সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এছাড়া বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে সরকারি কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপ্রয়োজনীয় সফর, বাস্তব ফলাফলহীন কর্মশালা এবং ব্যয়বহুল প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রশিক্ষণ শেষে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বাস্তব প্রয়োগ সীমিত থেকেছে। ফলে ব্যয়ের তুলনায় কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অবশ্যই প্রয়োজনভিত্তিক, ফলাফলনির্ভর এবং মূল্যায়নযোগ্য হতে হবে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় একটি কেন্দ্রীয় তদারকি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সরাসরি প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ না করে তাদের এলাকার প্রয়োজনীয় উন্নয়ন চাহিদার তালিকা একটি বিশেষ সেলের কাছে জমা দেবেন। সংশ্লিষ্ট সেল প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, আর্থিক যৌক্তিকতা এবং জনস্বার্থ বিবেচনা করে তা যাচাই করবে। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে এবং নিয়মিতভাবে অগ্রগতির প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করবে।

এই ব্যবস্থার অন্যতম সুবিধা হলো প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীভিত্তিক প্রভাব কমে আসার সম্ভাবনা। প্রকৃত প্রয়োজন ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প কমবে এবং সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন কাজের প্রতিটি ধাপে নজরদারি থাকলে অনিয়ম ও অপচয়ের সুযোগও হ্রাস পাবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ব্যবস্থার আরেকটি ইতিবাচক প্রভাব হতে পারে নির্বাচনী সংস্কৃতিতে। যদি জনপ্রতিনিধিদের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের ক্ষেত্র না হয়, তাহলে শুধুমাত্র আর্থিক লাভের আশায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রবণতা কমতে পারে। এতে জনসেবামুখী ও যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশের সুযোগ বাড়বে।

তবে এই ব্যবস্থার সফলতা নিশ্চিত করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রথমত, কেন্দ্রীয় তদারকি সেলকে অবশ্যই দক্ষ, স্বচ্ছ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এই প্রতিষ্ঠান যেন নতুন ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্র বা অনিয়মের উৎসে পরিণত না হয়।

দ্বিতীয়ত, প্রকল্প অনুমোদনের জন্য সুস্পষ্ট, প্রকাশ্য এবং তথ্যভিত্তিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোন প্রকল্প অনুমোদিত হলো এবং কোনটি বাতিল হলো, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হলে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।

তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে স্থানীয় পর্যায়ের জরুরি উন্নয়ন কার্যক্রম যেন বিলম্বিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন হয়। অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ধীরগতি করতে পারে।

চতুর্থত, প্রকল্প বাস্তবায়ন, ব্যয় এবং অগ্রগতির তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণ উন্নয়ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবে এবং সামাজিক জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী হবে।

সবশেষে বলা যায়, ব্যক্তি-কেন্দ্রিক ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, নাম পরিবর্তনজনিত অতিরিক্ত ব্যয় এবং প্রয়োজনহীন উন্নয়ন প্রকল্পের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। কেন্দ্রীয় তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে যদি প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচন, স্বচ্ছ অর্থব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন কার্যক্রম হবে আরও জনমুখী, কার্যকর এবং টেকসই। তবে এই উদ্যোগের চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহিতার ওপর।