ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৯:৩৪:২০ PM

জুন ক্লোজিংয়ের নামে ২৯ প্রকল্পের অর্থ লুট

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
13-08-2026 03:48:28 PM
জুন ক্লোজিংয়ের নামে ২৯ প্রকল্পের অর্থ লুট

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. ফজলুল করিম ও তাঁর বিশ্বস্ত অফিস সহায়ক মোবারক হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে জুন ক্লোজিংয়ের নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ, সরকারি বরাদ্দ লুটপাট, ভুয়া বিল-ভাউচার, ঘুষ-বাণিজ্য ও ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই জুন ক্লোজিংয়ের নামে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে একাধিক নথিও আমাদের মাতৃভূমি পত্রিকার হাতে এসেছে
বারক হোসেন ভূঁইয়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করলেও গজারিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে তাঁর ব্যাপক প্রভাব ও ক্ষমতা রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে গজারিয়া উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় ত্রাণ ও দুর্যোগ অফিসের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে নজর দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন মহল।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ঠিকাদাররা বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করতে গেলে তাদের কাছ থেকে ১০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গজারিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়কে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। উপজেলা পর্যায়ে কথিত এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের কেউ কেউ ‘মিস্টার ৩০%’, আবার কেউ ‘মিস্টার ১৫%’ নামে পরিচিত বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প থেকে প্রকাশ্যেই ঘুষ নেওয়া হয়েছে। পিআইও মো. ফজলুল করিমের হয়ে ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি মোবারক হোসেন ভূঁইয়া রফাদফা করতেন বলে সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একই অফিসে কর্মরত মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
ফজলুল করিম ও মোবারক হোসেন বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাদের নামে-বেনামে ফ্ল্যাট, বাড়ি, জমি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব সম্পদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
পিআইও ও তাঁর সহযোগীর বিরুদ্ধে টিআর (টেস্ট রিলিফ), কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য), কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) এবং এলজিএসপি প্রকল্প থেকে ভ্যাট ও ট্যাক্সের নামে বাধ্যতামূলকভাবে ১০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা বা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এলজিএসপি প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রেও একইভাবে পার্সেন্টেজ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। ঘুষের টাকা না দিলে প্রকল্পের ফাইল আটকে রাখা কিংবা বরাদ্দ বাতিলের হুমকি দেওয়া হতো বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের অসংখ্য প্রকল্পের কোনোটি মাঠপর্যায়ে সম্পূর্ণ, কোনোটি আংশিক বাস্তবায়িত হলেও আবার কোনো কোনো প্রকল্পের কাজ না করেই শতভাগ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ প্রকল্প কমিটির সভাপতিদের সঙ্গে আঁতাত করে মাস্টাররোলে ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
প্রতিবছর জুন ক্লোজিং বা অর্থবছর সমাপ্তির সময় কথিত এই চক্রটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও জুন ক্লোজিংয়ের নামে সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে গজারিয়া ত্রাণ ও দুর্যোগ কর্মকর্তার কার্যালয়কে ঘিরে। প্রকল্পের কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে গেলেও তড়িঘড়ি করে ভুয়া কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি করে প্রকল্পের অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইতোমধ্যে কাজ সম্পূর্ণ না করেই জুন ক্লোজিংয়ের নামে ২৯টি প্রকল্পের টাকা অগ্রিম তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন ও বাস্তবায়নের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং মাঠপর্যায়ে তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এদিকে গজারিয়া উপজেলায় গত কয়েক বছরে সোলার প্লান্টের নামে কয়েকটি প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের বিভিন্ন পয়েন্টে এক হাজারেরও বেশি সোলার লাইট স্থাপন করা হয় বলে জানা গেছে। স্থাপনের কিছুদিন পর এসব সোলার প্লান্টের লাইটে বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি দেখা দেয়। এরপর মেরামতের কথা বলে সোলার প্লান্টের ব্যাটারি ও লাইট খুলে নিজের জিম্মায় নিয়ে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে অফিস সহায়ক মোবারক হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। তবে যেসব স্থান থেকে এগুলো খুলে আনা হয়েছিল, সেসব স্থানে পরে আর অনেকগুলো পুনরায় স্থাপন করা হয়নি বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
অভিযোগ রয়েছে, মেরামতের নামে খুলে আনা সোলার লাইট, ব্যাটারি ও সোলার প্যানেল বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি মোবারক হোসেনের বাসা থেকে প্রায় ১২টি সোলার প্যানেল উদ্ধার করা হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই প্যানেলগুলো তাঁর বাসায় স্থাপন করে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
অভিযোগকারীদের মতে, সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও তাঁর সহযোগীর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে গজারিয়া উপজেলার গ্রামীণ অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলো তদন্ত এবং প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন মহল।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গজারিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ফজলুল করিম ও অফিস সহায়ক মোবারক হোসেন ভূঁইয়ার সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তবে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথিপত্র, বিল-ভাউচার, মাস্টাররোল, কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন, মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন এবং সোলার সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা জরুরি বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।