ঢাকা, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০১:৪০:৩৮ AM

মির্জা আব্বাস:দীর্ঘ জীবনের নীরব দৃঢ়তা

মান্নান মারুফ
15-03-2026 12:55:20 PM
মির্জা আব্বাস:দীর্ঘ জীবনের নীরব দৃঢ়তা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধৈর্য, অভিজ্ঞতা দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার এক উল্লেখযোগ্য নাম হলেন মির্জা আব্বাসসাম্প্রতিক সময়ে তাকে ঘিরে নানা বিতর্ক, সমালোচনা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ হলেও তিনি যেভাবে নীরবতা সংযম বজায় রেখেছেন, তা অনেকের কাছেই রাজনৈতিক ধৈর্যের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে ধরা দিয়েছে। ৭৫ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদকে ঘিরে গত কিছুদিনে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলো অনেক পর্যবেক্ষকের মতে রাজনৈতিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করেছে।

সম্প্রতি নাসীর উদ্দিন পাটোয়ারী প্রকাশ্যে মির্জা আব্বাসকে উদ্দেশ করে তীব্র মন্তব্য করেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—“তুমি কোন ......... আব্বাস?” পাটোয়ারীর অভিযোগ ছিল, মির্জা আব্বাস তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন। কিন্তু পরে জানা যায়, মির্জা আব্বাস নিজে কোনো মামলা করেননি। বরং তার নামে যে মামলা দায়ের করা হয়েছিল, সেই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দলীয়ভাবে শোকজ করা হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সময় থেকেই পাটোয়ারীর পক্ষ থেকে তাকে বহুবার ‘চাঁদাবাজ’ বা ‘গ্যাংস্টার’ আখ্যা দেওয়ার মতো অভিযোগও তোলা হয়, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়।

আরও একটি আলোচিত ঘটনা ঘটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ। একদিন তিনি সেখানে আহত ছাত্রনেতা ওসমান হাদি-কে দেখতে গেলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তাকে সরাসরি হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়। পোস্টটি করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর এক ছাত্রনেতা, যিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-এর সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়।

কিন্তু পরবর্তী তদন্ত তথ্য-উপাত্তে স্পষ্ট হয় যে, হাদির ওপর হামলা বা তাকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে মির্জা আব্বাসের কোনো ধরনের সম্পর্ক ছিল না। এমনকি অভিযোগ করা হয় যে, সংশ্লিষ্ট অনেককে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কখনও দেখেনওনি। তবুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে যে ধরনের অভিযোগ ছড়ানো হয়েছিল, তার জন্য প্রকাশ্যে কোনো ক্ষমা প্রার্থনার ঘটনাও ঘটেনি। এরপরও মির্জা আব্বাসের পক্ষ থেকে কোনো উত্তপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটাই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ধৈর্যের পরিচয় বহন করে। যারা আজ তাকে সমালোচনা করছেন, তাদের অনেকের রাজনৈতিক বয়সের চেয়েও তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দীর্ঘ।

মির্জা আব্বাস বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর একজন প্রবীণ নেতা। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন, তখন থেকেই মির্জা আব্বাস এই দলে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত করেন।

তার জন্ম একটি সম্ভ্রান্ত বনেদি পরিবারে। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন সক্রিয় উচ্চাভিলাষী। ১৯৬৬ সালে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। কর্মজীবনের শুরুতেই পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান “আব্বাস মির্জা এন্টারপ্রাইজ”-যুক্ত হন। ব্যবসায়িক দক্ষতা উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি পরবর্তীতে ব্যাংকিং খাতেও পদচারণা করেন এবং ঢাকা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৯৫ সালে তিনি ঢাকা ব্যাংকের বিকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে ব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতি ছিল তার মূল আগ্রহের ক্ষেত্র। ১৯৮০-এর দশকে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। সে সময় হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিএনপি এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

শুধু সেখানেই শেষ নয়। গত ১৫ বছর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর শাসনামলেও তাকে নানা রাজনৈতিক চাপ নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে দলীয় নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন। সময় একাধিকবার তাকে কারাবরণ করতে হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় তার পরিবারও চাপের মুখে পড়ে। তার বৃদ্ধ মা স্ত্রীও নানা হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে দাবি করা হয়। দীর্ঘ সময় তাকে কারাগারে থাকতে হয়েছে, তবুও তিনি দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে সরে দাঁড়াননি। এমনকি কঠিন সময়ে নিজের জমি বিক্রি করে কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাও তার রাজনৈতিক জীবনের একটি আলোচিত দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর মির্জা আব্বাসকে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় নগর উন্নয়ন, নাগরিক সেবা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে তার বেশ কিছু উদ্যোগ প্রশংসিত হয়।

পরবর্তীতে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হলে তিনি মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন। ২০০১ সালের ১১ অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি গৃহায়ন গণপূর্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তার মন্ত্রীত্বকালে ইমারত নির্মাণ নগর পরিকল্পনা সংক্রান্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। বিশেষ করে সংশোধিত ইমারত মালা আইন পাশ হওয়া তার সময়ের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

রাজনীতির পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক কাজেও মির্জা আব্বাসের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তিনি নিজ এলাকায় শিক্ষা সামাজিক উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ১৯৮০ সালে ঢাকার শাজাহানপুর এলাকায় নারী শিক্ষার প্রসারে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “মির্জা আব্বাস মহিলা কলেজ”, যা আজও শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্থানীয় মানুষের কাছে তার আরেকটি পরিচয় হলো সহজপ্রাপ্যতা। তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, সাধারণ মানুষ প্রয়োজনে তাকে সহজেই কাছে পেয়েছেন বলে এলাকাবাসীর মধ্যে প্রচলিত ধারণা রয়েছে।

ব্যক্তিগত জীবনে তার সহধর্মিণী আফরোজা আব্বাস-রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি বিএনপির মহিলা শাখা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৫ সালে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, নানা উত্থান-পতন এবং সাম্প্রতিক বিতর্কের মধ্যেও মির্জা আব্বাস যে সংযম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক আলাদা দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ অপপ্রচারের মধ্যেও সংযত থাকা—এই বৈশিষ্ট্যই তাকে অনেকের কাছে আলাদা করে তুলেছে।