ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৮:৩৭:৩২ AM

ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
20-07-2026 11:26:02 AM
ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে অভিযোগ

ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সমতা নিয়ে ওঠা অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান UNITY LAND SDN. BHD.-এর দুটি পৃথক শ্রমিক চাহিদাপত্র (ডিমান্ড লেটার)। অভিযোগ অনুযায়ী, একই প্রতিষ্ঠানের প্রথম আবেদন দীর্ঘদিন অনুমোদনহীন অবস্থায় আটকে থাকলেও পরবর্তীতে একটি বাংলাদেশি এজেন্সির মাধ্যমে জমা দেওয়া দ্বিতীয় আবেদন অল্প সময়ের মধ্যেই অনুমোদন পায়। একই সঙ্গে শ্রমিকের সংখ্যা ২৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ জন করা হয়। এই পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া নথি, আলোকচিত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রথম আবেদন: দীর্ঘদিন অনুমোদনহীন

নথি অনুযায়ী, ১ মে ২০২৬ তারিখে UNITY LAND SDN. BHD. বাংলাদেশ হাইকমিশনে সরাসরি ২৩০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগের জন্য একটি ডিমান্ড লেটার জমা দেয়। কোম্পানির পরিচালক CHANG CHAI WOON এবং নির্বাহী পরিচালক LEE SENG POH, JOHN-এর স্বাক্ষরিত আবেদনে বিভিন্ন পদের জন্য শ্রমিক চাওয়া হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সংযুক্ত করে আবেদনটি যথাযথ নিয়মেই দাখিল করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে আবেদনটি অনুমোদন কিংবা বাতিল—কোনোটিই করা হয়নি। ফলে এটি কার্যত অনির্দিষ্টকাল ধরে ঝুলে থাকে।

তাদের অভিযোগ, এই বিলম্বের কারণে কোম্পানি নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় জনবল সংগ্রহ করতে না পেরে ভারত ও নেপালসহ অন্যান্য দেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগে বাধ্য হয়। এতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

দ্বিতীয় আবেদন: এজেন্সির মাধ্যমে, দ্রুত অনুমোদন

প্রথম আবেদন নিষ্পত্তিহীন থাকার পর ১৯ জুন ২০২৬ তারিখে একই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নতুন করে আরেকটি আবেদন জমা দেওয়া হয়। তবে এবার আবেদনটি সরাসরি কোম্পানির পক্ষ থেকে নয়; Mariah Munawwarah Employment Agency-এর মাধ্যমে দাখিল করা হয়। একই সঙ্গে শ্রমিকের সংখ্যা বাড়িয়ে ৩০০ জন করা হয়।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় আবেদনটি তুলনামূলকভাবে দ্রুত অনুমোদন পায়। ৩০ জুনের মধ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রত্যয়ন সম্পন্ন হয় এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর ওয়েবসাইটে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

একই নিয়োগকর্তা, একই প্রকল্প—তবু ভিন্ন সিদ্ধান্ত

দুই আবেদনের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিয়োগকর্তা একই—UNITY LAND SDN. BHD.। প্রকল্পও একই এবং অধিকাংশ পদের ধরনেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নেই। মূল পার্থক্য দুটি—শ্রমিকের সংখ্যা ২৩০ থেকে ৩০০ জনে উন্নীত করা এবং আবেদন জমা দেওয়ার মাধ্যম পরিবর্তন।

এ অবস্থায় অভিযোগকারীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। প্রথম আবেদন যদি অসম্পূর্ণ বা নিয়মবহির্ভূত হয়ে থাকে, তাহলে তা লিখিতভাবে ফেরত দেওয়া হয়নি কেন? আর যদি আবেদনটি গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে, তাহলে একই ধরনের আবেদন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে জমা পড়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে অনুমোদন পেল কীভাবে?

Mariah Munawwarah Employment Agency-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

অভিযোগকারীদের দাবি, Mariah Munawwarah Employment Agency মূলত বাংলাদেশি শ্রমিক সরবরাহকারী একটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান। তাদের নিজস্ব বড় নির্মাণ প্রকল্প বা দৃশ্যমান অবকাঠামো কার্যক্রম নেই বলেই অভিযোগকারীদের দাবি।

তাদের প্রশ্ন, একটি প্রতিষ্ঠিত নির্মাণ কোম্পানি সরাসরি আবেদন করার পরও কেন পুনরায় একটি এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করতে হলো? অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোম্পানির প্রতিনিধিদের মৌখিকভাবে এজেন্সির মাধ্যমে নতুন আবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো লিখিত নির্দেশনা তারা পাননি।

প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি

ডিমান্ড লেটার দুটি ব্রুনাইয়ের বন্দর সেরি বেগাওয়ানের মুকিম কিয়াংগেহ এলাকায় একটি বৃহৎ আবাসন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য। প্রকল্পটিতে রয়েছে ১৮ তলা বিশিষ্ট চারটি আবাসিক ভবন, ১৫৯টি কনডোমিনিয়াম ইউনিট, ১৭টি বাণিজ্যিক ইউনিট এবং একটি দুইতলা ক্লাবহাউস।

প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদার UNITY LAND SDN. BHD.। এতে Surbana Jurong, Arkitek Urusreka এবং ACE Alamsejagat Consulting Engineers Sdn. Bhd.-সহ একাধিক প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের বাস্তব নির্মাণকাজের বড় অংশ ইতোমধ্যে Sri Maharani Sdn. Bhd.-এর কাছে সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বর্তমানে প্রকল্পের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তাদের সরবরাহ করা সাম্প্রতিক ছবিতে ভবনের বহিরাংশ প্রায় সম্পূর্ণ দেখা যায়। অন্যদিকে মে মাসের ছবিতে মূল কাঠামোগত নির্মাণ চলমান ছিল।

৮৫ শতাংশ কাজ শেষে ৩০০ শ্রমিকের প্রয়োজন কতটা যৌক্তিক?

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে এসেছে। যখন প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ পর্যায়ে, তখন অতিরিক্ত ৩০০ জন শ্রমিকের চাহিদা অনুমোদনের যৌক্তিকতা কী?

শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ ভবনের নির্মাণ শেষ পর্যায়ে পৌঁছালে সাধারণত শ্রমিকের প্রয়োজন কমতে থাকে। তখন মূলত ফিনিশিং, বৈদ্যুতিক, স্যানিটারি ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার কাজ চলে।

এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, অতিরিক্ত শ্রমিক অনুমোদনের আগে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি কি সাইট পরিদর্শনের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছিল? যদি হয়ে থাকে, তাহলে সেই পরিদর্শন প্রতিবেদন কোথায়? আর যদি সাইট পরিদর্শন না হয়ে থাকে, তাহলে কোন তথ্যের ভিত্তিতে ডিমান্ড লেটার প্রত্যয়ন করা হয়েছে?

অতিরিক্ত শ্রমিক পাঠানোর সম্ভাব্য ঝুঁকি

শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত শ্রমিক বিদেশে পাঠানো হলে একাধিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পর্যাপ্ত কাজ না পেয়ে শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়তে পারেন। অনেকেই চুক্তির বাইরে কম মজুরিতে অন্যত্র কাজ করতে বাধ্য হতে পারেন। কেউ কেউ অনিয়মিত বা অবৈধ শ্রমবাজারেও জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

এ ধরনের পরিস্থিতি শ্রমিক শোষণের আশঙ্কা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিমান্ড লেটার অনুমোদনের সময় শুধু কাগজপত্র নয়; প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, কাজের সময়কাল এবং নিয়োগ-পরবর্তী কর্মসংস্থানের স্থায়িত্বও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত ব্যাখ্যা নেই

অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, তারা বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাইবেন। প্রথম আবেদন আটকে রাখার কারণ, দ্বিতীয় আবেদন অনুমোদনের ভিত্তি, সম্ভাব্য সাইট পরিদর্শন প্রতিবেদন, এজেন্সির ভূমিকা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তসংক্রান্ত নথি প্রকাশের দাবি জানানো হবে।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বাংলাদেশ হাইকমিশন বা হাইকমিশনার নওরিন আহসানের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

বৃহত্তর প্রশ্ন

এই ঘটনাটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দুটি ডিমান্ড লেটারের বিষয় নয়। এটি ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, সমতা, জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

অভিযোগকারীদের মতে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যদি সন্দেহের ঊর্ধ্বে না থাকে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শ্রমিকরা, ক্ষুণ্ন হবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দেশের ভাবমূর্তি।