ঢাকা, রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৩:০৯:৫১ AM

সেনাসদস্যের ১০ দিনের কঠিন জীবনের গল্প

ফেসবুক থেকে নেয়া ।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
01-08-2026 11:54:16 AM
সেনাসদস্যের ১০ দিনের কঠিন জীবনের গল্প

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সদস্যকে আমরা সাধারণত পরিপাটি ইউনিফর্ম, কাঁধের ব্যাজ এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ উপস্থিতির মধ্যেই দেখি। তাঁদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও সম্মান স্বাভাবিকভাবেই গর্বের অনুভূতি জাগায়। তবে এই সম্মানের পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ত্যাগ, কঠোর পরিশ্রম, অনিদ্রার রাত, ক্ষুধা, ক্লান্তি এবং প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রামের গল্প, যা সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে যায়।

১০ দিনের একটি সামরিক অনুশীলন বা মিশনের শুরু থেকেই একজন সেনাসদস্যকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। পিঠে প্রায় ২০ কেজি বা তারও বেশি ওজনের ব্যাগ, যার ভেতরে থাকে প্রয়োজনীয় খাবার, পোশাক, তাঁবু তৈরির সরঞ্জাম, রান্নার সামগ্রী, পানির বোতল এবং ব্যক্তিগত অস্ত্র। কোনো যানবাহনের সুবিধা থাকে না; দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় শুধুই পায়ে হেঁটে।

কষ্ট আরও বেড়ে যায় যখন ২০ কিলোমিটারের দীর্ঘ যাত্রার শুরুতেই নেমে আসে ঝুম বৃষ্টি। মুহূর্তেই ভিজে যায় ইউনিফর্ম, আর ব্যাগ পানি শুষে নিয়ে আরও ভারী হয়ে ওঠে। ভেজা পোশাক, পানিতে ভরা বুট এবং কাদামাখা পথে প্রতিটি পদক্ষেপ যেন নতুন এক পরীক্ষার নাম। দীর্ঘক্ষণ হাঁটার ফলে কাঁধ অবশ হয়ে আসে, পিঠে ঘর্ষণে ক্ষত তৈরি হয় এবং ভেজা বুটের কারণে পায়ে ফোস্কা পড়ে। প্রতিটি পদক্ষেপে সেই ফোস্কার যন্ত্রণা অসহনীয় হয়ে ওঠে। তবুও থামার সুযোগ নেই, কারণ দায়িত্ব পালনই একজন সেনাসদস্যের প্রথম অঙ্গীকার।

বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি ও কাঁচা রাস্তা পরিণত হয় পিচ্ছিল কাদার ফাঁদে। কোথাও খাড়া ঢাল, কোথাও গভীর খাদ। ভারী ব্যাগ ও অস্ত্র নিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে চলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লেও দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকে না। এমন কঠিন মুহূর্তেও পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো শিশুর ছোট্ট একটি স্যালুট ক্লান্ত শরীরে নতুন উদ্দীপনা এনে দেয়। তখন মনে হয়, দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সব কষ্ট সার্থক।

দীর্ঘ ২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রমের পর বিশ্রামের জন্য মেলে মাত্র ১০ মিনিট। কেউ ব্যাগকে বালিশ বানিয়ে একটু পিঠ সোজা করেন, কেউ কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিশ্রাম শেষ হওয়ার সংকেত মিলতেই আবার শুরু হয় নতুন পথচলা।

রাত গভীর হলে দলটি পৌঁছায় জনমানবহীন কোনো জঙ্গল বা দুর্গম এলাকায়। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, নেই বিদ্যুৎ বা কোনো আধুনিক সুবিধা। সেখানে পৌঁছেই শুরু হয় নতুন দায়িত্ব। প্রথমে বাঁশঝাড়, কাঁটাঝোপ ও বুনো লতাপাতা পরিষ্কার করে থাকার জায়গা তৈরি করতে হয়। এরপর ভেজা মাটির ওপর সীমিত সরঞ্জাম দিয়ে তাঁবু খাটাতে হয়। কাদা, পোকামাকড়ের কামড় এবং অবিরাম বৃষ্টির মধ্যেও কাজ থেমে থাকে না।

গভীর রাতে ক্ষুধা মেটানোর জন্য শুরু হয় রান্নার প্রস্তুতি। ভেজা কাঠে আগুন জ্বালানো অত্যন্ত কঠিন। ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে, তবুও কোনোভাবে রান্না শেষ করতে হয়। কখনো আধাসেদ্ধ ভাত, কখনো শুকনো রুটি—যা পাওয়া যায়, সেটাই তখন পরিশ্রমের পর অমূল্য খাবার হয়ে ওঠে।

খাওয়া শেষ করেই বিশ্রামের সুযোগ মেলে না। শুরু হয় পাহারার দায়িত্ব বা সেন্ট্রি ডিউটি। গভীর রাতের অন্ধকারে, প্রবল বৃষ্টি ও বুনো পরিবেশের মধ্যে সতর্ক থাকতে হয়, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি না হয়। কয়েক দিন ধরে টানা অনিদ্রা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং প্রতিনিয়ত সতর্ক অবস্থায় থাকার কারণে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি চরমে পৌঁছে যায়।

এ ধরনের অনুশীলনে অনেক সময় টানা কয়েক দিন গোসলের সুযোগ থাকে না। ভেজা পোশাক শরীরেই শুকিয়ে যায়, আবার বৃষ্টিতে ভিজে যায়। ঘাম, কাদা ও আর্দ্রতার কারণে ত্বকে নানা সমস্যা দেখা দিলেও দায়িত্ব পালনে কোনো শিথিলতা আসে না। শরীর যখন আর চলতে চায় না, তখনও দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা এবং দেশের প্রতি ভালোবাসাই তাঁদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।

আমরা যখন নিরাপদ ঘরে নিশ্চিন্তে রাত কাটাই, তখন দেশের কোনো না কোনো সীমান্ত, পাহাড় কিংবা দুর্গম জঙ্গলে একজন সেনাসদস্য নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে চলেন। তাঁদের এই ত্যাগ, শৃঙ্খলা ও আত্মনিবেদনই দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম ভিত্তি। ইউনিফর্মের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই অদেখা সংগ্রামের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন সেনাসদস্যের সম্মান শুধু তাঁর পোশাকের জন্য নয়, বরং দেশের জন্য প্রতিনিয়ত করা নীরব ত্যাগের জন্য।