মরণোত্তর পদোন্নতিপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জাহিদকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এবং তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। পরিবার ও সমর্থকদের দাবি, মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে হত্যা করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদেরও চরম সামাজিক, পারিবারিক ও মানসিক দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন মেজর জাহিদকে জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং হাতকড়া পরা অবস্থায় তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরিবারের দাবি, ঘটনাটি ছিল একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবার শুধু প্রিয়জনকেই হারায়নি, বরং শুরু হয় দীর্ঘ আইনি ও সামাজিক সংকটের অধ্যায়।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন সরকারের আমলে তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। সে সময় তাঁদের বড় মেয়ের বয়স ছিল মাত্র সাত বছর এবং ছোট মেয়ের বয়স ছিল এক বছর। ছোট মেয়েটি মায়ের সঙ্গে কারাগারেই বেড়ে ওঠে। অন্যদিকে বড় মেয়েটি আত্মীয়ের বাসায় থেকে বড় হতে থাকে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, মাকে দেখতে কারাগারে গেলে বড় মেয়েটি কান্নায় ভেঙে পড়ত, যা পুরো পরিবারের জন্য ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ব্রিগেডিয়ার জাহিদের স্ত্রী জামিনে মুক্তি পান। তবে মুক্তির প্রায় ছয় মাসের মাথায় তাঁকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে ডাকা হয়। পরিবারের দাবি, সেখানে অধ্যাপক আমেনা মহসিন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন প্রভাষক (যাঁর পরিচয় পরিবার নিশ্চিত করতে পারেনি) তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, ধর্মীয় অনুশীলন এবং স্বামীর অতীত সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। কিছুদিন পর আদালতে শুনানির মাধ্যমে তাঁর জামিন বাতিল করা হয় বলে পরিবারের দাবি।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, জামিন বাতিলের খবর শুনে তাঁর মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাঁকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। এ সময় একের পর এক পারিবারিক শোক নেমে আসে। ২০২০ সালে তাঁর বাবা মৃত্যুবরণ করেন এবং ২০২২ সালে, যখন তিনি কারাগারে ছিলেন, তখন তাঁর মাও মারা যান। কারাবন্দি থাকায় তিনি বাবা কিংবা মায়ের শেষ বিদায়ে উপস্থিত থাকতে পারেননি। পরিবারের দাবি, মেজর জাহিদের মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর বাবা-মা ছেলেকে হারানোর শোক সহ্য করতে না পেরে মারা যান।
পরিবার ও তাঁদের সমর্থকদের মতে, এই দীর্ঘ সময়জুড়ে তাঁরা সামাজিক অপমান, মানসিক চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং আইনি জটিলতার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। তাঁদের দাবি, একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যার প্রভাব বিশেষ করে দুই শিশুকন্যার শৈশবের ওপর গভীরভাবে পড়েছে।
এছাড়া পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তৎকালীন সময়ে কিছু গণমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন মেজর জাহিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে জনমনে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ভূমিকা রেখেছিল। বিশেষভাবে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার-এর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলোর এ বিষয়ে অবস্থান বা প্রতিক্রিয়া এখানে অন্তর্ভুক্ত নয়।
সবশেষে, পরিবার ও সমর্থকরা মনে করেন, ব্রিগেডিয়ার জাহিদ এবং তাঁর পরিবারের ত্যাগ, কষ্ট ও সংগ্রাম বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁদের প্রার্থনা, মহান আল্লাহ যেন ব্রিগেডিয়ার জাহিদকে শহীদের মর্যাদা দান করেন এবং তাঁর পরিবারকে এই দীর্ঘ কষ্টের যথাযথ প্রতিদান ও শান্তি প্রদান করেন।