রাজধানীর মিরপুরের দুয়ারীপাড়ায় গত কয়েক দিনে রাতের আঁধারে একের পর এক প্লট দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। টিন ও বাঁশের বেষ্টনী দিয়ে প্লট ঘিরে ফেলা, স্থাপনা ভাঙচুর এবং অস্থায়ী ঘর নির্মাণের মাধ্যমে এসব দখলচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের। এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামও সামনে এসেছে।
দুয়ারীপাড়ার ৮ নম্বর সেকশনের সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকার ‘ক’ ব্লকে গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে মো. সুমন হোসেনের একটি প্লট দখলের চেষ্টা করা হয়। রাত প্রায় ৩টার দিকে একদল ব্যক্তি প্লটটিতে ঢুকে টিনের বেষ্টনী তৈরি করে এবং ভেতরে অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করে। খবর পেয়ে ভোর ৫টার দিকে সুমন লোকজন নিয়ে ঘটনাস্থলে গেলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। পরে তিনি স্থাপনাটি ভেঙে সরিয়ে দেন।
সুমন হোসেনের অভিযোগ, এ ঘটনায় থানায় গেলে মামলা নেওয়া হয়নি এবং ফোন করেও তাৎক্ষণিক পুলিশি সহায়তা পাওয়া যায়নি। তবে ৯৯৯-এ ফোন করার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে বলে জানান তিনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় প্রতি রাতেই কোনো না কোনো প্লটে দখলের চেষ্টা হচ্ছে। প্রথমে রাতের আঁধারে স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। পরে বাঁশ, কাঠ ও টিন দিয়ে প্লট ঘিরে অস্থায়ী ঘর তৈরি করা হয়। এরপর সেখানে বস্তির কোনো পরিবারকে তুলে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে ওই পরিবারকে সামনে রেখে দখল করা জমির মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি করা হয়।
দুয়ারীপাড়ার ‘ক’ ব্লকের ২ নম্বর রোডে ‘প্রকল্প অফিস’ নামে একটি অফিসের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানে শতাধিক বাঁশ, কাঠ ও টিনের তৈরি বেষ্টনী রাখা ছিল। স্থানীয়দের দাবি, রাতের বেলা প্লট দখলের কাজে এসব বেষ্টনী ব্যবহার করা হয়।
‘ক’ ব্লকের ৬ নম্বর রোডের ৪ নম্বর প্লটেও দখলচেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। প্লটটির মালিকদের একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য এবং অন্যদের মধ্যে একজন বেসরকারি টেলিভিশনের উপস্থাপিকা রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, প্লটের বেষ্টনী ও সাইনবোর্ড ভেঙে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ওই নারী জানান, প্রতি রাতে এভাবে প্লট পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়।
এদিকে ‘ক’ ব্লকের ৮ নম্বর রোডের ১০ ও ১১ নম্বর প্লট সম্প্রতি বেদখল হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১১ নম্বর প্লটের ভেতরে অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি ইটের গাঁথুনিও দেখা গেছে। সেখানে থাকা আব্দুর রহিম জানান, ‘মোবারক মেম্বার’ তাঁকে সেখানে উঠিয়েছেন এবং প্লট পাহারা দেওয়ার জন্য মাসে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
রূপনগর থানায় করা একাধিক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও অভিযোগের কপি এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দখলচেষ্টার সঙ্গে জড়িত হিসেবে বেশ কয়েকজনের নাম সামনে এসেছে। তাঁদের মধ্যে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে। অভিযোগে রূপনগর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শিপু মোল্লা, ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতা কামাল ওরফে সিএনজি কামাল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা মোহাম্মদ মামুন, আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক হোসেন মেম্বারসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। রূপনগর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ মামুন বলেন, এ বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। রূপনগর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শিপু মোল্লার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
সামগ্রিক বিষয়ে রূপনগর থানা বিএনপির আহ্বায়ক এম আশরাফ ইসলাম বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে কোনো অনিয়ম বা চাঁদাবাজির সুযোগ নেই। কেউ এমন কাজে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি দাবি করেন, কয়েকজন ভুক্তভোগী তাঁর কাছে এলে তিনি ঝুঁকি নিয়ে কিছু প্লট উদ্ধার করে দিয়েছেন।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের। পুলিশ কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না, সে প্রশ্ন ওসি ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের করা উচিত।
রূপনগর থানার ওসি মোহাম্মদ নোমান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলে জানান।