পর্ব–৪
এর মধ্যেই একদিন হঠাৎ করেই মুখ ফসকে কুদ্দুছ বলে ফেলল—
“ঐশি… আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
কথাটা বলার পর মুহূর্তের মধ্যেই যেন চারপাশের বাতাস থমকে গেল। বিকেলের শেষ আলোটা কলেজের মাঠের ঘাসের উপর নিঃশব্দে ঝরে পড়ছিল। দূরে কয়েকটা কাক ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে যাচ্ছিল আকাশের দিকে।
ঐশি যেন প্রথমে বুঝতেই পারল না কুদ্দুছ ঠিক কী বলেছে।
সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার চোখ দুটো কুদ্দুছের মুখের দিকে উঠল। সেই চোখে বিস্ময় ছিল, অবিশ্বাস ছিল, আর ছিল এক অদ্ভুত ক্ষোভ।
“তুমি কি বললে?”—ঐশির কণ্ঠ কাঁপছিল।
কুদ্দুছ মাথা নিচু করে ফেলল। তবুও সাহস জোগাড় করে আবার বলল,
“আমি… আমি তোমাকে ভালোবাসি, ঐশি।”
মুহূর্তের মধ্যেই যেন সবকিছু বদলে গেল।
ঐশির মুখ লাল হয়ে উঠল রাগে। তার বুকের ভেতর যেন দমবন্ধ করা ঝড় বইতে লাগল।
“তুমি এটা ভাবলে কীভাবে?”—ঐশির কণ্ঠে তীব্র রাগ।
কুদ্দুছ থমকে গেল।
“আমরা বন্ধু ছিলাম, তাই না?”—ঐশি বলল।
“তুমি কি ভাবলে… আমি তোমার সাথে এসব নিয়ে ভাবি?”
কুদ্দুছের গলা শুকিয়ে গেল। সে তো কখনও ঐশিকে আঘাত করতে চায়নি। তার মনে হয়েছিল—ঐশিও হয়তো তাকে একটু হলেও ভালোবাসে। সেই নীরব দৃষ্টি, সেই একসাথে হাঁটা, সেই ছোট ছোট হাসি—সবকিছু যেন তাকে সাহস দিয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবতা যে এত কঠিন হবে, সেটা সে বুঝতে পারেনি।
ঐশি আবার বলল,
“আমি এসব কখনও ভাবিনি, কুদ্দুছ। কখনও না।”
তারপর সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে গেল।
কুদ্দুছ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল যেন কেউ তার বুকের ভেতর থেকে সব আলো নিভিয়ে দিয়েছে।
সেদিনের পর থেকেই শুরু হলো কুদ্দুছের জীবনের এক নতুন অধ্যায়—কষ্টের, নীরবতার, আর অদৃশ্য যন্ত্রণার অধ্যায়।
ঐশি এখন আর তার সাথে কলেজে যায় না।
আগে তারা প্রায় প্রতিদিন একসাথে রাস্তা দিয়ে হাঁটত। শিউলি ফুলে ভরা সেই পথ এখন কুদ্দুছের কাছে অদ্ভুত ফাঁকা লাগে।
সে একা হাঁটে।
কখনও কখনও দূর থেকে দেখে—ঐশি অন্য বান্ধবীদের সাথে হাঁটছে। কিন্তু তার দিকে একবারও তাকায় না।
কুদ্দুছ বুঝতে পারে—ঐশি ইচ্ছে করেই তাকে এড়িয়ে চলছে।
কলেজের করিডোরেও এখন আর আগের মতো দেখা হয় না। যদি কখনও হঠাৎ মুখোমুখি হয়ে যায়, ঐশি সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে তাকিয়ে নেয়।
কুদ্দুছের বুকটা তখন মোচড় দিয়ে ওঠে।
সে কখনও ভাবেনি—তার ভালোবাসার কথাটা এত বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াবে।
একদিন লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল কুদ্দুছ। সেই পুরোনো আমগাছটার নিচে। যেখানে তারা কত বিকেল একসাথে কাটিয়েছে।
আজ সেখানে শুধু হালকা বাতাস বইছে।
হঠাৎ সে দেখল—ঐশি লাইব্রেরি থেকে বের হচ্ছে।
কুদ্দুছের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।
“ঐশি…”
ঐশি থেমে গেল ঠিকই, কিন্তু তার মুখে কোনো কোমলতা ছিল না।
“কিছু বলবে?”—শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল সে।
কুদ্দুছ অনেক কষ্টে বলল,
“তুমি কি আমার সাথে কথা বলবে না আর?”
ঐশি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
“আমার মনে হয় আমাদের দূরে থাকাই ভালো।”
কুদ্দুছ যেন ছুরির আঘাত পেল।
“কেন?”—তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
ঐশি বলল,
“কারণ তুমি আমাদের সম্পর্কটা অন্যদিকে নিয়ে যেতে চেয়েছ। আর আমি সেটা চাই না।”
কুদ্দুছ বলল,
“আমি তো শুধু সত্যিটা বলেছি…”
ঐশি এবার একটু কঠোর হয়ে উঠল।
“সব সত্যি বলা দরকার হয় না।”
এই কথাটা বলে সে চলে গেল।
কুদ্দুছ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে ধীরে ধীরে আমগাছটার নিচে বসে পড়ল।
তার মনে হচ্ছিল—জীবনের সব রং যেন মুছে গেছে।
দিন যেতে লাগল।
কিন্তু ঐশি তার সিদ্ধান্তে অটল রইল।
সে নিজে থেকেই কুদ্দুছের সাথে চলাফেরা বন্ধ করে দিল। কলেজে যাওয়ার সময় আলাদা রাস্তা ধরে যেতে শুরু করল।
এমনকি কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ করে দিল।
কুদ্দুছ অনেকবার চেষ্টা করেছে—কোনো একটা কথা বলার, ভুল বোঝাবুঝি মেটানোর।
কিন্তু ঐশি প্রতিবারই তাকে এড়িয়ে গেছে।
এতে কুদ্দুছের কষ্ট আরও বেড়ে গেল।
রাতে সে ঘুমাতে পারে না। জানালার পাশে বসে থাকে অনেকক্ষণ।
আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে—ভালোবাসা কি সত্যিই এত বড় ভুল?
সে তো শুধু তার হৃদয়ের কথাটা বলেছিল।
একদিন বিকেলে বৃষ্টি পড়ছিল।
কুদ্দুছ একা দাঁড়িয়ে ছিল সেই রাস্তার মোড়ে—যেখান দিয়ে ঐশি প্রতিদিন বাড়ি ফেরে।
হঠাৎ সে দেখল—ঐশি ছাতা মাথায় নিয়ে হাঁটছে।
কুদ্দুছের মনটা আবার কেঁপে উঠল।
সে এগিয়ে গেল।
“ঐশি… এক মিনিট।”
ঐশি থামল না।
কুদ্দুছ আবার বলল,
“আমি আর কিছু চাই না। শুধু বন্ধু হয়ে থাকতে পারি না?”
ঐশি এবার থামল।
ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
তার চোখে তখন অদ্ভুত এক ক্লান্তি।
“বন্ধুত্ব?”—সে মৃদু হেসে বলল।
“যেখানে ভালোবাসা এসে গেছে, সেখানে বন্ধুত্ব আগের মতো থাকে না, কুদ্দুছ।”
কথাটা বলে সে আবার হাঁটা শুরু করল।
বৃষ্টির ফোঁটা তখন আরও জোরে পড়ছিল।
কুদ্দুছ দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে তখন বৃষ্টির সাথে মিশে যাচ্ছিল অশ্রু।
সে বুঝতে পারল—কিছু কিছু ভালোবাসা হয়তো কখনও পূর্ণতা পায় না।
কিছু অনুভূতি শুধু নীরব কষ্ট হয়ে মানুষের জীবনে থেকে যায়।
আর সেই কষ্টই হয়তো একদিন হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে গভীর স্মৃতি।
কুদ্দুছ তখনও জানত না—
এই দূরত্বই একদিন তাদের দুজনের জীবনে আরও বড় ঝড় ডেকে আনবে।
কারণ নিয়তি কখনও মানুষের অনুভূতির প্রতি খুব একটা দয়া দেখায় না।
আর ভালোবাসা…
সেটা কখনও কখনও সবচেয়ে সুন্দর, আবার সবচেয়ে নিষ্ঠুর গল্পও হয়ে ওঠে।
চলবে…