ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০১:২৯:২২ AM

উপন্যাস: তোমাকে ভালবাসি

মান্নান মারুফ
16-03-2026 12:55:22 PM
উপন্যাস: তোমাকে ভালবাসি

পর্ব–

কুদ্দুছ সেদিন রাতভর ঘুমাতে পারেনি। ঘরের জানালার পাশে বসে ছিল সে। আকাশে চাঁদ ছিল, কিন্তু তার মনে যেন কোনো আলো ছিল না। চারদিকে সবকিছু আগের মতোই আছে—গাছ, বাতাস, রাতের নীরবতা—তবুও কুদ্দুছের কাছে পৃথিবীটা যেন হঠাৎ অচেনা হয়ে গেছে।

সে বারবার একই চিন্তায় ডুবে যাচ্ছিল।

সে কি করবে?

ঐশিকে সে ভুলতে পারছে না। আবার তাকে নিজের কাছে রাখার কোনো পথও নেই।

প্রেমের টান যেন তাকে দুই দিক থেকে টেনে ছিঁড়ে ফেলছে।

একদিকে স্মৃতি—ঐশির সেই হাসি, সেই চোখের চাহনি, সেই একসাথে হাঁটার দিনগুলো।
অন্যদিকে বাস্তবতা—ঐশি এখন অন্য কারও হয়ে যাবে।

পরদিন সকালে কুদ্দুছ বাজারে গিয়েছিল। সেখানে কয়েকজন মানুষের কথাবার্তা তার কানে এলো।

শুক্রবারই নাকি বিয়ে।”
ছেলেটা বিদেশে থাকে।”
বিয়ের পর ঐশিকে বিদেশে নিয়ে যাবে।”

এই কথাগুলো শুনে কুদ্দুছের বুকটা যেন হঠাৎ ভেঙে গেল।

বিদেশে নিয়ে যাবে…

মানে ঐশি এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে।

চিরদিনের জন্য।

কুদ্দুছ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে উঠল।

সে মনে মনে ভাবল—

তাহলে সত্যিই শেষ…”

সেই মুহূর্তে তার মনে হলো—তার জীবনের সব পথ যেন বন্ধ হয়ে গেছে।

সে ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরে এল।

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

টেবিলের ওপর একটা সাদা কাগজ ছিল। কুদ্দুছ সেটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে কলমটা হাতে তুলে নিল।

তার হাত কাঁপছিল।

কাগজের ওপর সে লিখতে শুরু করল—

ঐশি,

তুমি ভালো থেকো।

আমি জানি, আমার ভালোবাসা তোমার কাছে কোনো মূল্য পায়নি। হয়তো আমি ভুল সময় ভুল কথা বলেছিলাম।

আমি আর কখনও তোমাকে বিরক্ত করব না।

তুমি সুখে থাকো—এই কামনাই করি।

আর কোনোদিন তোমাকে নিয়ে ভাববো না।

হয়তো তোমার বিদায়ের আগেই আমি বিদায় নেব।

কুদ্দুছ”

চিঠিটা লেখা শেষ করে কুদ্দুছ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তার মনে হচ্ছিল—এই কয়েকটা লাইনই যেন তার পুরো জীবনের গল্প।

তারপর সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে।

আকাশে লালচে আলো।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে ঐশিদের বাড়ির দিকে চলে গেল।

বাড়ির সামনে এখনো মানুষের আনাগোনা।

বিয়ের প্রস্তুতি চলছে।

কেউ আলো লাগাচ্ছে, কেউ চেয়ার সাজাচ্ছে, কেউ আবার হাসতে হাসতে গল্প করছে।

এই আনন্দের মাঝেই কুদ্দুছের বুকটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।

সে চিঠিটা একজন ছোট ছেলের হাতে দিল।

ধীরে বলল—

ঐশির কাছে দিয়ে দিও।”

ছেলেটা মাথা নেড়ে ভেতরের দিকে চলে গেল।

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে বাড়ির পেছনের দিকে চলে গেল।

ঐশিদের বাড়ির পেছনে একটা পুরোনো গাব গাছ আছে।

শৈশব থেকে সেই গাছটা এই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে।

অনেক বিকেল কুদ্দুছ দূর থেকে সেই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ঐশিকে দেখেছে।

আজও সে সেই গাছটার দিকে এগিয়ে গেল।

চারদিকে তখন নীরবতা।

দূরে শুধু মানুষের কথাবার্তার শব্দ ভেসে আসছে।

কুদ্দুছ আকাশের দিকে তাকাল।

তার চোখে তখন অদ্ভুত এক শান্তি।

মনে হচ্ছিল—সে যেন সব কষ্টের হিসাব মিটিয়ে ফেলেছে।

সে ধীরে ধীরে গাছের দিকে তাকাল।

তারপর…

রাতটা নীরবে কেটে গেল।

ভোর হওয়ার একটু আগে একজন মানুষ ঐশিদের বাড়ির পেছনের দিকে গিয়েছিল।

হঠাৎ তার চোখে পড়ল—গাব গাছের ডালের সাথে কেউ ঝুলছে।

সে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল—

মানুষ! মানুষ ঝুলছে!”

মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির সবাই ছুটে এলো।

কেউ একজন চিৎকার করে উঠল—

তো কুদ্দুছ!”

চারদিকে হঠাৎ হৈচৈ পড়ে গেল।

মানুষ দৌড়ে আসতে লাগল।

কেউ বলছে—
কি হয়েছে?”

কেউ বলছে—
কুদ্দুছ নেই!”

খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো গ্রামে খবর পৌঁছে গেল—

কুদ্দুছ আর নেই।

ঐশির বিয়ের আগে রাতেই সে নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছে।

বাড়ির ভেতর তখন কান্নার রোল উঠেছে।

মানুষজন স্তব্ধ হয়ে গেছে।

ঠিক তখনই ঐশির হাতে পৌঁছাল সেই চিঠিটা।

সে কাঁপতে কাঁপতে কাগজটা খুলল।

চিঠির লাইনগুলো পড়তে পড়তে তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

তুমি ভালো থেকো…
হয়তো তোমার বিদায়ের আগেই আমি বিদায় নেব…”

ঐশির হাত থেকে কাগজটা মাটিতে পড়ে গেল।

তার বুকের ভেতর যেন হঠাৎ সবকিছু ভেঙে পড়ল।

সে দৌড়ে বের হয়ে এল বাড়ির পেছনের দিকে।

মানুষের ভিড়ের ফাঁক দিয়ে যখন সে কুদ্দুছকে দেখল—তখন তার পৃথিবী যেন থেমে গেল।

সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে লাগল।

সে ফিসফিস করে বলল—

কুদ্দুছ… তুমি এটা কি করলে…”

কিন্তু তখন আর কোনো উত্তর আসার মতো কেউ ছিল না।

চারদিকে শুধু মানুষের ভিড়, কান্না আর স্তব্ধতা।

ভালোবাসা কখনও কখনও মানুষকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়—যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না।

কুদ্দুছের ভালোবাসা ছিল নিঃস্বার্থ।

কিন্তু সেই ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত তাকে জীবন থেকে দূরে নিয়ে গেল।

আর ঐশির জীবনে রেখে গেল এক অনন্ত অপরাধবোধ, এক অব্যক্ত বেদনা।

সেই গাব গাছটা আজও দাঁড়িয়ে আছে।

গ্রামের মানুষ এখনো মাঝে মাঝে সেই গাছের দিকে তাকিয়ে বলে—

এখানেই শেষ হয়েছিল কুদ্দুছের ভালোবাসার গল্প…”

চলবে...........