ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ১০:৪৪:৪৮ PM

উপন্যাস: মুক্তিচাই

মান্নান মারুফ
02-04-2026 09:10:24 PM
উপন্যাস: মুক্তিচাই

চতুর্থ পর্ব

সেদিন কারাগারে ঢোকার সময় অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছিল—
যেন আমি কোনো মানুষকে দেখতে যাচ্ছি না, বরং একটা দীর্ঘ নীরবতার সাক্ষী হতে যাচ্ছি।

হাজতি শওকত মাহমুদের সঙ্গে নতুন করে পরিচয়ের পর থেকে আমার ভেতরে একটা পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।
আগে সংবাদ ছিল খবর, এখন তা হয়ে উঠছে অনুভূতি।
আগে মানুষ ছিল চরিত্র, এখন তারা হয়ে উঠছে গল্পের প্রাণ।

আজ তাকে দেখলাম রুমের এক কোণে বসে আছেন, মাথা নিচু।
তার সামনে একটা পুরনো খাতা।

আমি কাছে যেতেই তিনি খাতাটা বন্ধ করে ফেললেন।

“কি লিখছিলেন?”—আমি জিজ্ঞেস করলাম।

তিনি একটু হাসলেন।
“নিজের বিচার।”

আমি অবাক হলাম।

“বিচার?”

তিনি মাথা তুললেন।
চোখদুটো আজ অদ্ভুতভাবে স্থির।

“হ্যাঁ। বাইরে তো অনেকেই বিচার করছে—মিডিয়া, মানুষ, রাজনীতি… কিন্তু নিজের বিচারটা তো নিজেকেই করতে হয়।”

আমি ধীরে ধীরে বসে পড়লাম।

“তাহলে কী রায় দিলেন?”

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

“আমি নির্দোষও না, পুরোপুরি দোষীও না।”

তার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা ছিল না—
ছিল এক ধরনের নির্মম সত্যের স্বীকারোক্তি।

“জানো,”—তিনি আবার বললেন—
“আমরা যারা রাজনীতিতে থাকি, তারা অনেক সময় সত্যকে নিজের মতো করে দেখি। যেটা আমাদের পক্ষে যায়, সেটাকেই সত্য বলে মানি।”

আমি চুপ করে শুনছিলাম।

“কিন্তু এই দেয়ালের ভেতরে এসে বুঝেছি—
সত্য আসলে একটাই, আর সেটা খুব কঠিন।”

তার কথাগুলো যেন ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ছিল।

“আপনি কি অনুতপ্ত?”—আমি জিজ্ঞেস করলাম।

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“অনুতাপ… হ্যাঁ, আছে। কিন্তু সেটা নিজের জন্য না—
যাদের আমি বিশ্বাস করিয়েছি, তাদের জন্য।”

এই কথাটা শুনে আমি থমকে গেলাম।

তিনি আবার বললেন,
“আমি অনেক মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছি। হয়তো সব স্বপ্ন সত্যি হয়নি।”

তার চোখে আজ জল চিকচিক করছিল।

এটা প্রথমবার, যখন আমি তার ভেতরের দুর্বলতাটা এত স্পষ্ট দেখলাম।

“আপনি কি ক্ষমা চান?”

তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“ক্ষমা চাওয়ার মতো কেউ নেই এখানে।
যারা ছিল, তারা এখন দূরে।”

একটু নীরবতা নেমে এলো।

তারপর তিনি হঠাৎ বললেন,
“তুমি কি কখনও ভেবেছো, মানুষ সবচেয়ে বেশি একা কখন হয়?”

আমি মাথা নাড়লাম।

তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“যখন তার চারপাশে অনেক মানুষ থাকে, কিন্তু কেউ তার সত্যিটা বুঝতে পারে না।”

আমি অনুভব করলাম, এই মানুষটা শুধু কারাগারে বন্দি না—
তিনি নিজের ভেতরেও বন্দি।

“আপনি কি মুক্তি চান?”—আমি আবার প্রশ্ন করলাম।

তিনি সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকালেন।

“সবাই মুক্তি চায়। কিন্তু সবাই জানে না, সে কোন মুক্তিটা চায়।”

আমি থেমে গেলাম।

“আপনি?”

তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“আমি শুধু এই দেয়াল থেকে না…
নিজের ভেতরের বোঝা থেকেও মুক্তি চাই।”

তার কণ্ঠে আজ এক ধরনের গভীর ক্লান্তি ছিল,
কিন্তু সেই ক্লান্তির ভেতরেও একটা দৃঢ়তা লুকিয়ে ছিল।

হঠাৎ বাইরে থেকে এক প্রহরীর কণ্ঠ ভেসে এলো—
সময় শেষ।

আমি উঠে দাঁড়ালাম।

“আমি আবার আসব,”—বললাম।

তিনি মাথা নেড়ে বললেন,
“এসো। এই নীরবতাকে কেউ না কেউ তো শুনুক।”

কারাগার থেকে বের হয়ে আসার সময় মনে হচ্ছিল—
বাইরের পৃথিবীতে যত বিচার হয়,
তার চেয়েও কঠিন বিচারটা মানুষ নিজের ভেতরে করে।

আর সেই বিচারেই হয়তো জন্ম নেয় সত্যিকারের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

এই গল্পটা এখন আর শুধু একজন মানুষের নয়—
এটা হয়ে উঠছে এক আত্মার যাত্রা,
ভুল থেকে সত্যের দিকে,
বন্ধন থেকে মুক্তির দিকে।

(চলবে…)