ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৯:২৫:০৭ PM

সাজাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাই গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
11-08-2026 07:07:12 PM
সাজাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাই গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী

ভুয়া পিএইচডি সনদ ও জাল কাগজপত্র দেখিয়ে উচ্চশিক্ষা ছুটিতে বিদেশে অবস্থানের অভিযোগে বিভাগীয় মামলায় দণ্ডিত হয়েছিলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। বিভাগীয় তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি দোষ স্বীকার করেন। তবে অভিযোগের তুলনায় তাকে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। মাত্র এক বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়।

দাপ্তরিক নথি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই শাস্তির কয়েক বছরের মধ্যেই রাজনৈতিক ও পারিবারিক যোগাযোগের প্রভাব কাজে লাগিয়ে খালেকুজ্জামান একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতি পান। বর্তমানে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে কর্মরত। তাকে স্থায়ীভাবে প্রধান প্রকৌশলী করার প্রক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের বিভিন্ন নথি পর্যালোচনায় জানা যায়, ২০১৬ সালে ভুয়া অফার লেটার ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় প্রেষণে যাওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তৎকালীন গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট তার এক বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে ‘ফুপু-ভাতিজা’ সম্পর্কের পরিচয় দিয়ে খালেকুজ্জামান গুরুদণ্ড এড়িয়ে যান। তবে সাজেদা চৌধুরীর ছেলে সাজেদ আকবর এ সম্পর্কের বিষয়ে তার পরিচয় থাকার কথা জানেন না বলে মন্তব্য করেছেন।

দ্রুত পদোন্নতির অভিযোগ

সরকারি চাকরির সার্ভিস রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২২ জুলাই খালেকুজ্জামান চৌধুরী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে নিয়মিত পদোন্নতি পান। একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর তাকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী করা হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রচলিত জ্যেষ্ঠতার ধারা অনুসরণ না করেই ওই পদোন্নতি দেওয়া হয়।

১৯৮৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাকরিজীবনে বিভিন্ন প্রেষণ ও ছুটির সুযোগে তিনি প্রায় ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন বলে তার পার্সোনাল ডাটা শিটে (পিডিএস) উল্লেখ রয়েছে। পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হলে তিনি দেশে ফিরতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর তার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতায় পরিবর্তন আসে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের স্ত্রী ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরীকে (সুইটি) তিনি ‘ফুপু’ হিসেবে পরিচয় দেন বলে জানা গেছে। তাদের পারিবারিক সম্পর্কের সূত্র ধরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি সুবিধা নিয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে তাকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর (চলতি দায়িত্ব) পদে বসানো হয় বলে নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর আগে তিনি গোপালগঞ্জ গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জ্যেষ্ঠদের বাদ দিতে মামলার তথ্য

প্রধান প্রকৌশলীর পদ স্থায়ী করার লক্ষ্যে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) বৈঠকের জন্য গত ৬ জুলাই গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নাম পাঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই তালিকায় প্রশাসনিক জ্যেষ্ঠতা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় শীর্ষে থাকা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের ও উৎফল কুমার দে-কে পেছনে ফেলে খালেকুজ্জামানের নাম তালিকার শীর্ষে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ। একই তালিকায় রয়েছেন মো. শহিদুল আলম এবং ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দার।

নথিপত্রের বরাতে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ রুদ্ধ করতে জুলাই-পরবর্তী সময়ে রামপুরা থানার একটি মামলায় তাদেরসহ ৪৭ জন প্রকৌশলীর নাম আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই মামলার নথি এসএসবিতে জমা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বদলি ও টেন্ডার নিয়ে অভিযোগ

প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পর খালেকুজ্জামানের বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের কাছ থেকে ১০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য আর্থিক লেনদেনের তথ্য প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।

চলতি বছরের ৩ মার্চ একদিনে অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে বড় ধরনের এ রদবদলের কারণে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে অধিকাংশ বদলি বাতিল করা হয়।

এ ছাড়া বড় প্রকল্পের পাঁচটি দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য ফেরত পাঠানোর ঘটনাতেও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, নির্ধারিত আর্থিক সুবিধা না পাওয়ায় এসব দরপত্র আটকে রাখা হয়েছিল। তবে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

খালেকুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নথি জালিয়াতি, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ছেলে সাজেদ আকবর বলেন, একই নির্বাচনি এলাকায় বাড়ি হওয়ার কারণে অনেকেই তার মায়ের কাছে আসতেন এবং কেউ কেউ নিজেদের ক্ষমতার কাছাকাছি রাখতে আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি করতেন। তবে খালেকুজ্জামানকে তিনি চেনেন না এবং তার মায়ের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল কি না, তাও জানেন না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, জালিয়াতি বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত কোনো কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসানো ঝুঁকিপূর্ণ। তার মতে, প্রতিটি পদায়নের আগে কর্মকর্তাদের পেশাগত ও প্রশাসনিক পটভূমি যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ১০ আগস্ট খালেকুজ্জামান চৌধুরীর দপ্তরে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।