ঢাকা, রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ১১:৪১:৩৩ AM

পদ্মা রেলে ১৩ হাজার কোটি টাকার নয়ছয়

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
09-08-2026 10:35:44 AM
পদ্মা রেলে ১৩ হাজার কোটি টাকার নয়ছয়

দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে সরকারি নিরীক্ষা (অডিট)। প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর পরও মূল চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত ব্যয়, প্রকৃত কাজের তুলনায় বেশি বিল পরিশোধ, নিম্নমানের কাজের বিপরীতে অর্থ ছাড়সহ নানা অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে অডিটে।

সরকারি বিশেষ নিরীক্ষায় প্রকল্পটির ২০টি অডিট আপত্তিতে এই বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। অডিটে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অতিরিক্ত পরিশোধ করা অর্থ ঠিকাদারের কাছ থেকে আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে। এসব অনিয়মের সময় প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মো. আফজাল হোসেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সরকারি অডিট, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে এসব তথ্য জানা গেছে। গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত নিরীক্ষাটি পরিচালিত হয়।

কাজ কম, বিল দেওয়া হয়েছে বেশি

অডিটের সবচেয়ে বড় আপত্তিগুলোর একটি ঢাকা-যশোর রেললাইন নির্মাণ নিয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল নকশায় রেললাইনের বাঁধের গড় উচ্চতা ৭ দশমিক ৩ মিটার নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তী জরিপে তা কমিয়ে ৫ দশমিক ৬ মিটার করা হয়। এতে মাটি ভরাটসহ বিভিন্ন কাজের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

তবে কাজের পরিমাণ কমলেও ঠিকাদারকে বিল অব কোয়ান্টিটিজ (বিওকিউ) অনুযায়ী শতভাগ বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়। এতে ২ হাজার ১৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে। অডিটের হিসাবে, ঠিকাদারের কাছ থেকে এ অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করেছে, চুক্তি অনুযায়ী ডলারে বিল পরিশোধ করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত কোনো অর্থ দেওয়া হয়নি। তবে এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ।

অতিরিক্ত রেল আমদানির অভিযোগ

অডিটের আরেকটি আপত্তিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ২ হাজার ৮৫৫ টন ইউআইসি-৬০ রেল আমদানি করা হয়। এর ফলে শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর বাবদ ১২ কোটি ৫১ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মূল স্পেসিফিকেশনের তুলনায় কম গ্রানুলার স্যান্ড ব্যবহার করেও ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা পরিশোধ, চুক্তির শর্ত ভেঙে বিওকিউ বাড়িয়ে ৭২৮ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় এবং দেশীয় মালামালের মূল্য ডলারে পরিশোধ করে ৫১৯ কোটি ৯১ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ করা হয়েছে।

প্রকল্পকে ‘বিশেষায়িত কাজ’ দেখিয়ে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি দামে চুক্তি করায় ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগও রয়েছে।

আরও নানা অনিয়মের অভিযোগ

অডিট প্রতিবেদনে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি প্রতিবেদনের তুলনায় বেশি কাজ দেখিয়ে ১ হাজার ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধের অভিযোগ করা হয়েছে। একই জমির মূল্য দ্বিতীয়বার নির্ধারণ করে ১৭১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত অনুদান, ভাঙ্গা রেলস্টেশনের নকশা পরিবর্তনে ২৮৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া গাড়ি কেনায় ১১০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া ব্যালাস্টের পুরুত্ব কম দিয়েও ২৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা পরিশোধ, উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া জমির সীমানা পিলার স্থাপনে ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, চুক্তির বাইরে ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার কেনায় ২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা এবং সরকারি জমির মূল্য ব্যক্তির নামে পরিশোধ দেখিয়ে ১১ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

অতিরিক্ত অর্থ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে দিয়ে এফডিআরে রাখায় ৪১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ভাঙ্গা জংশনে অতিরিক্ত মাটি ভরাট দেখিয়ে ৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং অন্যান্য খাতে আরও বেশ কিছু অনিয়মের কথাও অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিজির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ

পদ্মা রেল প্রকল্পের অডিট আপত্তির পাশাপাশি রেলওয়ের নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ কেনায় ৬৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ তদন্তে রেল মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে। তবে তদন্ত শেষ হলেও প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানেও আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে পাথর সরবরাহ ও মোটর মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব আর্থিক লেনদেন যাচাই করতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সহযোগিতা চেয়েছে দুদক। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো চূড়ান্তভাবে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।

জবাব ও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস

অভিযোগের বিষয়ে ডিজি মো. আফজাল হোসেন বলেন, অডিটের অধিকাংশ আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং অনেক আপত্তি প্রত্যাহারও করা হয়েছে। হালনাগাদ তথ্যের জন্য তিনি প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলেন।

বর্তমান প্রকল্প পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া বলেন, ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তির বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ একে একে জবাব দিচ্ছে। অডিট আপত্তি উঠলেই সেটিকে অনিয়ম বলা যায় না; উত্থাপিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এত বড় প্রকল্পে ওঠা অভিযোগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, রেলের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সরকার নজরে রেখেছে। প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।