ঢাকা, শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:৫৫:০৪ AM

আইএফআইসির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ

ষ্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
31-07-2026 11:28:00 AM
আইএফআইসির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক তদন্ত প্রতিবেদনে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, সুশাসন লঙ্ঘন, প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ, নিয়মবহির্ভূত সম্মানী গ্রহণ, নিয়োগে অনিয়ম, অনুমোদনহীন বিদেশ সফর এবং ব্যক্তিগত প্রচারণাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তকারী দল মনে করছে, ব্যাংকটিতে সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সালমান এফ রহমানের প্রভাবাধীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশ্নবিদ্ধ ঋণ অনুমোদন এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মো. মেহমুদ হোসেনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর অনিয়ম কমার পরিবর্তে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন করে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতিবিভাগের (বিআরপিডি) সার্কুলার অনুযায়ী কোনো চেয়ারম্যান বা পরিচালক ব্যাংকের দৈনন্দিন প্রশাসনিক বা পরিচালনাগত কাজে অংশ নিতে বা হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৩৮ কার্যদিবসের মধ্যে ২২ দিন গুলশান, প্রিন্সিপাল ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখা পরিদর্শন করেন এবং মেঘনা কর্পোরেশন, প্ল্যামি ফ্যাশন, সিলভার গ্রুপ ও মার্স পলি অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজের মতো বড় করপোরেট গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে এসব কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর চেয়ারম্যান ব্যাংকের সব শাখা ও উপশাখায় নিজের ছবি ও বাণী প্রদর্শনের নির্দেশ দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পরিপন্থী এ উদ্যোগ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

পরিচালনা পর্ষদের অতিরিক্ত সম্মানী গ্রহণের বিষয়েও তদন্তে একাধিক অনিয়ম উঠে এসেছে। বিতর্কিত ঋণসংক্রান্ত তদন্তে পরিচালক কাজী মো. মাহবুব কাশেম ও স্বতন্ত্র পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হককে নিয়ে গঠিত দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি আটটি বৈঠক করে মোট ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী গ্রহণ করে। একইভাবে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা (সিআরও) এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন বিভাগের প্রধান নিয়োগের সাক্ষাৎকার বোর্ডে অংশ নিয়ে পরিচালকদের আরও ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়া হয়। ফলে দুই খাতে মোট অতিরিক্ত সম্মানীর পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

এ ছাড়া চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন, সরকার মনোনীত পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা, স্বতন্ত্র পরিচালক কাজী মো. মাহবুব কাশেম এবং সরকার মনোনীত পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হক ব্যাংকের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে প্রত্যেকে ১৭ হাজার ২৫০ টাকা করে সম্মানী গ্রহণ করেন।

তদন্তে আরও দেখা যায়, নিয়ম অনুযায়ী মাসে একটি সাধারণ বোর্ড সভা হওয়ার কথা থাকলেও চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন পর্ষদ প্রায় প্রতি মাসেই চার থেকে পাঁচটি সভা করেছে। পাশাপাশি তদন্ত কমিটি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং বিভিন্ন উপকমিটির বৈঠকের নামে অতিরিক্ত সম্মানী প্রদান করা হয়েছে। শুধু অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির ছয়টি সভার জন্যই পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী গ্রহণ করেছেন। এছাড়া অডিট, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নির্বাহী কমিটির নামে একাধিক অতিরিক্ত সভা আয়োজন করে ব্যাংকের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের মূল ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ব্যাংকের অর্থে বিদেশ সফর করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণের পরও এসব ব্যয়ের অর্থ এখনো ব্যাংকের তহবিলে ফেরত দেওয়া হয়নি।

বিশেষ করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি মানি ট্রান্সফার (ইউকে) লিমিটেডকে কেন্দ্র করে বোর্ড সভা, বিমান ভাড়া, ভাতা ও আবাসন ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হলেও এখন পর্যন্ত কোনো লভ্যাংশ দেশে আসেনি। অথচ ২০১১ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির সভায় অংশ নিতে যুক্তরাজ্য সফরে ব্যাংকের প্রায় ৯ কোটি ৫৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও একাধিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে। ঋণ পুনরুদ্ধার বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদকে হেড অব রিকভারি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মো. মুজাহিদ কবিরের নিয়োগে পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত ছাড়পত্রের কপি নথিতে পাওয়া যায়নি। হেড অব কার্ডস অ্যান্ড ডিজিটাল ব্যাংকিং পদে মো. জাকির হোসেনের নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বয়সসীমা অনুসরণ করা হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া চেয়ারম্যান তার পূর্ববর্তী কর্মস্থলের কয়েকজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন বলে তদন্তে বলা হয়েছে। এক্সিম ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক থেকে বরখাস্ত হওয়া বা অনিয়মে অভিযুক্ত কয়েকজনকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত ২৩ জুলাই চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত প্রতিবেদনে আইএফআইসি ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ বন্ধ, সব শাখা ও উপশাখা থেকে চেয়ারম্যানের ছবি ও ব্যক্তিগত প্রচারসামগ্রী অপসারণ, তদন্ত ও প্রশিক্ষণের নামে নেওয়া অতিরিক্ত সম্মানী দ্রুত ব্যাংকের তহবিলে ফেরত দেওয়া এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে। প্রয়োজনে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতাও বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আইএফআইসি ব্যাংকের মোট শেয়ার সংখ্যা ১৯২ কোটি ২০ লাখ ৮৬ হাজার ৬৪৭টি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের গত ৩০ জুনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ শেয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের, ২১ দশমিক ২৩ শতাংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের, ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এবং ০ দশমিক ৬৪ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। টানা দুই বছর লোকসানে থাকা ব্যাংকটি ২০২৫ সালে ২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে।

অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ও গ্রাহকের আস্থা বজায় রাখতে সুশাসন, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। তদন্তে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা আরও শক্তিশালী হবে।