ভিসা-টিকিট ঠিক থাকলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখার অভিযোগ, অতিরিক্ত ব্যাগেজের অর্থ আত্মসাৎ ও টিকিট আপগ্রেড বাণিজ্য হাতে বৈধ কাগজপত্র। ভিসা-টিকিটও ঠিকঠাক। তারপরও বোর্ডিং পাস পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে যাত্রীদের। একপর্যায়ে ‘সমস্যা সমাধান’-এর নামে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। অতিরিক্ত ব্যাগেজের অর্থ আত্মসাৎ থেকে শুরু করে ইকোনমি ক্লাসের টিকিট বিজনেস ক্লাসে আপগ্রেড—সবখানেই চলছে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্যাসেঞ্জার ও গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগের কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে যাত্রী হয়রানি ও অর্থ আত্মসাতের একটি চক্র গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। মাসব্যাপী অনুসন্ধানে এ-সংক্রান্ত একাধিক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও যাত্রীদের নানা অজুহাতে আটকে রেখে অর্থ আদায় করা হয়। অতিরিক্ত ব্যাগেজের ক্ষেত্রেও নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ নেওয়া এবং তা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যাত্রীরা যেমন চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তেমনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা কোনোভাবেই অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হতে পারে না। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও কোনো যাত্রীকে অযথা আটকে রেখে হয়রানি করা হলে তা অত্যন্ত গুরুতর অনিয়ম।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সিস্টেম লগ, ব্যাগেজ ট্যাগ, পেমেন্ট রেকর্ড ও সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিমানবন্দরের সেবা ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
বিমানের গ্রাহকসেবা বিভাগের পরিচালক বদরুল হাসান লিটন বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে এয়ারপোর্ট সার্ভিস বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর করছে। প্রয়োজনে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, যাত্রী হয়রানি রোধে জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ।
কাউন্টারকেন্দ্রিক চক্রের অভিযোগ
সূত্রমতে, বিমানবন্দরের প্যাসেঞ্জার সার্ভিস বিভাগের একজন কাউন্টার সুপারভাইজার ও একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের নেতৃত্বে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে চেকইন ব্যাগেজের ওজন ও হিসাবের ক্ষেত্রে কারসাজি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং সেই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও যাত্রীদের বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা এবং এক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে ঘোরানোর অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, হজ এজেন্সিগুলোর সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বিজনেস ক্লাসের আসন বরাদ্দ এবং কিছু যাত্রীর কাছ থেকে অর্থ নিয়ে বোর্ডিং পাস দেওয়ার মতো অনিয়মও করা হয়।
চক্রটির সদস্য হিসেবে গ্রাউন্ড সার্ভিস সুপারভাইজার (জিএসএস) মো. জসিম উদ্দিন (জি-৫২১৯৫), গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট (জিএসএ) মোহাম্মাদ বুরহান উদ্দিন (জি-৫৩০৪৭) এবং জিএসএ মিজানুর রহমান ফিরোজের (জি-৫৩০৩০) নাম উঠে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পৃথকভাবে উপস্থাপন করা জরুরি।
৫২ হাজার টাকায় অতিরিক্ত দুটি ব্যাগ?
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৮ আগস্ট বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩০৫ ফ্লাইটের যাত্রী মাহমুদ সারওয়ার চেকইনের জন্য জিএসএ মিজানুর রহমান ফিরোজের কাউন্টারে যান। তার সঙ্গে ছিল চারটি লাগেজ।
অভিযোগ অনুযায়ী, ব্যাগেজ এলাকায় কর্মরত হেলপার ইব্রাহিম ওই যাত্রীর সঙ্গে ৫২ হাজার টাকার বিনিময়ে অতিরিক্ত দুটি ব্যাগ চেকইনের বিষয়ে সমঝোতা করেন। পরে ইব্রাহিম জিএসএ মো. বুরহানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বুরহান ওই যাত্রীকে মিজানুর রহমান ফিরোজের লাইনে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
রাত ১২টা ৫১ মিনিটে মিজানুর রহমান ফিরোজ মাহমুদ সারওয়ারের নামে ২৩ ও ২২ কেজি ওজনের দুটি ব্যাগ চেকইন করেন। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, অতিরিক্ত দুটি ব্যাগ যাত্রীর নিজের নামে ট্যাগ না করে অন্য একটি গ্রুপের চার যাত্রীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
ওই চার যাত্রীর টিকিট নম্বর ছিল ৯৯৭২১০২২১৫৮৬১/২/৩/৪ এবং সিকোয়েন্স নম্বর ছিল ১৩৬ থেকে ১৩৯। তাদের চেকইন রাত ১১টা ১৮ মিনিটে জিএসএ বুরহান সম্পন্ন করেন।
চার যাত্রীর জন্য মোট আটটি ব্যাগের সুবিধা থাকলেও তারা পাঁচটি ব্যাগ জমা দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বুরহানের পরামর্শে ফিরোজ ওই গ্রুপের সঙ্গে আরও দুটি ব্যাগ যুক্ত করেন। সিকোয়েন্স ১৩৭-এর যাত্রী রুমেনা/হুসনা জান্নাতের নামে দুটি ব্যাগের ট্যাগ ইস্যু করা হয়।
নিজের ব্যাগের ট্যাগে অন্যের নাম
নিজের ক্লেইম ট্যাগে অন্য যাত্রীর নাম দেখতে পেয়ে মাহমুদ সারওয়ার প্রতিবাদ করেন। একপর্যায়ে তিনি চিৎকার শুরু করলে বিমানের সিকিউরিটি সুপারভাইজার মো. নিয়াজ মোরশেদ ভূঁইয়া ঘটনাস্থলে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, অতিরিক্ত দুটি ব্যাগের জন্য ৫২ হাজার টাকা নেওয়া হলেও যাত্রীকে কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি। বরং অন্য যাত্রীর নামে ব্যাগ বুকিং করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
এ সময় মাহমুদ পেমেন্ট স্লিপ ও নিজের নামে ক্লেইম ট্যাগ দাবি করেন। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে হেলপার ইব্রাহিম তার পকেট থেকে ৫২ হাজার টাকা বের করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে নিরাপত্তা সুপারভাইজার তার পাশ জব্দ করেন।
এরপর যাত্রীর প্রোফাইলে আরও দুটি ব্যাগ যুক্ত করে নতুন ট্যাগ ইস্যু করা হয় এবং ব্যাগগুলো বেল্টে পাঠানো হয়। ব্যাগগুলো বে-১-এ পৌঁছালে লোডিং সুপারভাইজার আগের ট্যাগ খুলে নতুন ট্যাগ লাগিয়ে দেন।
নথি অনুযায়ী, নতুন ট্যাগ ইস্যুর প্রায় ১১ মিনিট পর রাত ১টা ৫৮ মিনিটে মিজানুর রহমান ফিরোজ আগের দুটি ট্যাগ সিস্টেম থেকে ডিলিট করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরে হেলপার ইব্রাহিমের কাছ থেকে ৫২ হাজার টাকা এবং যাত্রীর কাছ থেকে আরও আনুমানিক ১০ হাজার টাকা নেওয়ার পর পেমেন্ট স্লিপ ইস্যু করা হয়।
অভিযোগের পরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়নি
অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাটি নিয়ে দীর্ঘ দেনদরবারের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ক্ষমা চাইলেও কাউন্টার সুপারভাইজারের হস্তক্ষেপে তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে অভিযোগটির সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ, ব্যাগেজ ট্যাগ, সিস্টেম লগ, পেমেন্ট রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
বৈধ ৯ যাত্রীর কাছ থেকে জনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা দাবি
শুধু অতিরিক্ত ব্যাগেজ নয়, বোর্ডিং পাস আটকে রেখেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২১ জুলাই বিজি-৩২৭ ফ্লাইটে আবুধাবি হয়ে পর্তুগালগামী নয় যাত্রীর কাগজপত্র পাসপোর্ট চেকিং ইউনিট (পিসিইউ) শাখার কর্মীরা যাচাই করেন এবং তাদের চেকইনের অনুমতি দেন।
কিন্তু এরপর কাউন্টার সুপারভাইজার তাদের চেকইন না করে জনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর সংশ্লিষ্ট এজেন্সি টাকা দিতে রাজি হলে তাদের বোর্ডিং পাস দেওয়া হয় বলে সূত্রের দাবি।
এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন। বিশেষ করে ওই সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ, চেকইন সিস্টেমের লগ, যাত্রীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট এজেন্সির আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করলে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।
সিঙ্গাপুর ফ্লাইটে ব্যাগেজ ফি আত্মসাতের অভিযোগ
আরেক ঘটনায় সিঙ্গাপুরগামী একটি ফ্লাইটের এক যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ব্যাগেজ ফি বাবদ ৫ হাজার টাকা নেওয়ার পর তা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে জিএসএ বুরহানের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরে ওই যাত্রী বোর্ডিং গেটে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেন। এরপর ঘটনা ধামাচাপা দিতে সংশ্লিষ্ট কাউন্টার সুপারভাইজার সিস্টেমে এডিট করে ওই অর্থ অ্যাকাউন্টে জমা দেখান বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় পেমেন্ট রেকর্ড ও সিস্টেম লগ যাচাই করলে প্রকৃত ঘটনা নির্ণয় করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
টিকিট আপগ্রেডেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
এই চক্রের বিরুদ্ধে টরন্টোগামী ফ্লাইটে অর্থের বিনিময়ে ইকোনমি ক্লাসের যাত্রীদের বিজনেস ক্লাসে আপগ্রেড করার অভিযোগও রয়েছে।
কয়েকটি সূত্রের দাবি, গ্রাউন্ড সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা কয়েক বছর ধরে হজ ক্যাম্পে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় হজ এজেন্সিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বিজনেস ক্লাসের আসন বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অভ্যন্তরীণ নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
নজরদারি জোরদারের দাবি
বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে তা শুধু ব্যক্তিগত অনিয়মের বিষয় নয়; এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি, রাজস্ব এবং যাত্রীসেবার মানও জড়িত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো তদন্তে চেকইন সিস্টেমের লগ, ব্যাগেজ ট্যাগের ইতিহাস, পেমেন্ট রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ডিউটি রোস্টার পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।