স্বাস্থ্যখাতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন এখনও অধরাই রয়ে গেছে—এমন অভিযোগ বিভিন্ন মহলে দীর্ঘদিনের। সংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী ঠিকাদার স্বাস্থ্যখাতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল, তাদের একটি অংশ এখন নতুন ক্ষমতার বলয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে উঠেছে। এই বলয়ের সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা যুক্ত রয়েছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তাদের মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পার) মো. মুস্তাফিজুর রহমান, মন্ত্রীর এপিএস মোস্তাফিজুর রহমান, কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) পরিচালক ও যুগ্মসচিব মোহাম্মদ শফিউর রহমান এবং মন্ত্রীর একান্ত সচিব এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার। অভিযোগ অনুযায়ী, এই বলয় বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি এবং টেন্ডারসংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর অভ্যন্তরীণ বিভক্তির সুযোগ নিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। কিছু নেতাকে সুবিধা দিয়ে অন্যদের চাপের মধ্যে রাখা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা অতীতেও বিভিন্ন সরকারের আমলে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন এবং বর্তমানেও সেই প্রভাব বজায় রেখেছেন। তাদের বিরুদ্ধে অতীতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও সেসবের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা সরকারি তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
এদিকে স্বাস্থ্যখাতে পুরোনো ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব ঠিকাদার ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, বেনামে ঠিকাদারি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছিল, তাদের একটি অংশ এখনও বিভিন্ন নামে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে সরকারি কাজ পাচ্ছে। অতীতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করলেও পরবর্তীতে অনেক তদন্তের অগ্রগতি থেমে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে হাসপাতালের এমএসআর (মেডিকেল, সার্জিক্যাল ও রিএজেন্ট) সামগ্রী ক্রয়কে কেন্দ্র করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটিয়ে প্রতিযোগিতা সীমিত করে ফেলছেন। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের মাধ্যমে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) ক্রয় কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, এখানকার গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটাগুলো একটি নির্দিষ্ট বলয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ অনুযায়ী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পার অধিশাখার মাধ্যমে এসব প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন পদায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত বা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্টদের সম্মান রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।