রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আলোচনা জোরালো হয়েছে। সরকারের ভেতরে ও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে দলীয় ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় ঠিক কতজন নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হবেন, কারা বাদ পড়বেন কিংবা কোন মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসবে—এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করা হবে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে নানা সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর সরকার প্রশাসন ও মন্ত্রিসভায় আরও কার্যকর সমন্বয় আনতে চাইতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ—এসব বিষয় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ফলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কর্মদক্ষতার মন্ত্রীদের সরিয়ে অভিজ্ঞ ও সক্রিয় নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতিও সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের নিম্নচাপের সঙ্গে সাম্প্রতিক গ্যাস সংকট যুক্ত হওয়ায় অনেক কারখানা সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতিও শিল্প খাতে চাপ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে উৎপাদন ব্যাহত এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ সরকারের কাছে দ্রুত জ্বালানি সংকট সমাধানের দাবি জানিয়েছে। সম্প্রতি বস্ত্রশিল্পের উদ্যোক্তারাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে গ্যাস সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী সমস্যা সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এরই মধ্যে মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি দায়িত্বশীল দলীয় সূত্রের দাবি, বিএনপির বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতা এখনো মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। অন্যদিকে বর্তমান মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের গত কয়েক মাসের কর্মকাণ্ড নিয়েও দলের বিভিন্ন পর্যায়ে অসন্তোষ রয়েছে। ফলে সরকার ও দলকে আরও গতিশীল করতে নতুন কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
দলীয় ও রাজনৈতিক মহলে আলোচিত সম্ভাব্য নামের মধ্যে রয়েছেন নজরুল ইসলাম খান, ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শামসুজ্জামান দুদু, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, রুহুল কবির রিজভী ও জয়নুল আবদিন ফারুক। তবে এসব নাম এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে একাধিক নামের আলোচনা এসেছে।
প্রতিমন্ত্রী পদে হাবিব উন নবী খান সোহেল, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থসহ আরও কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে বলে রাজনৈতিক সূত্রের দাবি। তবে তাদের নিয়োগের বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
দলীয় সূত্রগুলো আরও বলছে, মন্ত্রিসভাকে শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র, পানি সম্পদ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় থাকতে পারে।
রুহুল কবির রিজভীকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে দলীয় গুরুত্বপুর্ন দায়িত্বের পাশাপাশি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের বয়স এখনো খুব বেশি নয়। তাই শুরুতেই মন্ত্রিসভার বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস করা হলে এর মাধ্যমে সরকার প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে চাচ্ছে—এমন বার্তা যেতে পারে। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করা হলে সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে গতি আসতে পারে।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধু মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনলেই চলমান সংকটের সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন, আইনশৃঙ্খলা, বিনিয়োগ ও জনদুর্ভোগ কমাতে কার্যকর নীতি এবং দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষে সরকার মন্ত্রিসভায় কী ধরনের পরিবর্তন আনে এবং নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তরা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়।