ঢাকা, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৪:৪১:৪০ AM

ডিপিডিসির ৩০ লাখের বাজেট নিয়ে রহস্য

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
09-10-2026 07:44:23 PM
ডিপিডিসির ৩০ লাখের বাজেট নিয়ে রহস্য

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) মাতুয়াইল এনওসিএস কার্যালয়কে ঘিরে ঘুষ বাণিজ্য, মিটার কারসাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের তদন্ত শুরু হওয়ার পর নতুন করে ডিজিটাল আলামত গোপন ও তদন্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সার্ভারে সংরক্ষিত তথ্য, মিটারের রিডিং ও ডিজিটাল লগ পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

অভিযোগে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দীন, উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার তালুকদার, মো. মঞ্জুরুল কাদের, লাইনম্যান মেট মো. ওবাইদুর রহমান টিপু, ড্রাইভার মো. উজ্জ্বল মিয়াসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র পরিচালনার অভিযোগ করা হয়েছে। নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ, লোড বৃদ্ধি, মিটার পরিবর্তন ও বিল সংশোধনের ক্ষেত্রে অবৈধ অর্থ আদায় এবং অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে গ্রাহকদের হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে।

তুষারধারা এলাকার বাসিন্দা মো. শরিফ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেওয়ার পর বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব মো. আবু লাইছের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন পিডিবির উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. বনি আমিন এবং ডিপিডিসির ম্যানেজার (আইসিটি) মো. হেলাল উদ্দিন।

তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মাতুয়াইল ডিভিশনের আইসিটি শাখার লাইনম্যান মেট মো. ফিরোজ শেখের (পরিচিতি নম্বর ২১২৮৩) সহায়তায় মিটারের রিডিং, সার্ভারের তথ্য ও ডিজিটাল লগ পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ কাজে ফিরোজ শেখের সঙ্গে পাঁচ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি গুলশান ও ধানমন্ডিতে গোপন বৈঠক করে তদন্ত প্রভাবিত করতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

লোড ও মিটার ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, তুষারধারায় সাবিনা ইয়াসমিনের দুটি হিসাবে মোট ৯৮ কিলোওয়াট লোড থাকা সত্ত্বেও একটি নয়তলা ভবনে উচ্চচাপের (এইচটি) পরিবর্তে নিম্নচাপের (এলটি) সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য ১৪ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে তুষারধারার লক্ষ্মীপুর টাওয়ার-সংলগ্ন এক গ্রাহকের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে এইচটি সংযোগকে এলটি সংযোগে রূপান্তর এবং অনুমোদিত পরিকল্পনার বাইরে আটটি অতিরিক্ত মিটার দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সেকান্দার আলী ও মোহাম্মদ নুরুজ্জামান হাওলাদারের বহুতল ভবনেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।

মেসার্স রহমান রাবার অ্যান্ড টায়ারের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের মার্চে মিটার পরিবর্তন করা হলেও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিল করার অভিযোগ রয়েছে। এ সময়ে ডুপ্লিকেট মিটার ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি। সুলতানা রাজিয়ার একটি ভবনের নির্মাণকাজের পুরোনো মিটার রিডিংসহ সরিয়ে নতুন মিটার স্থাপনের অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া আনোয়ার প্লাস্টিকে ১২ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে সাবস্টেশন নির্মাণ এবং সোলারবিহীন সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। মেসার্স বিএলসি টোল রুম অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সোলার ও পাওয়ার ফ্যাক্টর ইমপ্রুভমেন্ট (পিএফআই) ব্যবস্থা ছাড়া সংযোগ দেওয়া এবং অন্য ডিভিশন থেকে মিটার এনে স্থাপনের অভিযোগও রয়েছে। এসব অনিয়মের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও কারিগরি তথ্য যাচাই প্রয়োজন।

তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ

স্থানীয় বাসিন্দা রহমান ব্যাপারী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সার্ভার, মিটার ডেটাবেস, লগ ফাইল, সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট নথি দ্রুত সংরক্ষণ করা না হলে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগে নাম আসা কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক দায়িত্ব থেকে সাময়িক বিরত রাখার দাবিও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী অভিযোগ করেন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হানিফ উদ্দিনের নির্দেশের বাইরে কাজ করা কঠিন। তাঁর দাবি, বাশার-মঞ্জুরুলের সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া সংযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিযুক্ত উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার তালুকদার নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, মাতুয়াইল ডিভিশনে নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দীনের নির্দেশের বাইরে কিছু করা সম্ভব ছিল না। তাঁর দাবি, তিনি হেলালের কথিত সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন না; বরং ফিরোজ শেখ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ড্রাইভার মো. উজ্জ্বল মিয়াও কোনো অনিয়ম বা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফিরোজ শেখ বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দীন তাঁর অভিভাবকের মতো এবং তিনি তাঁর পাশে আছেন।

সব মিলিয়ে মাতুয়াইল এনওসিএস কার্যালয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, রাজস্ব সুরক্ষা ও জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, ডিজিটাল তথ্যের অখণ্ডতা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষণ জরুরি। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। ভুক্তভোগীরা দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।