ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৪:৩৩:১২ AM

শেষ ইচ্ছায় হবু বরের হৃদয়বিদারক সিদ্ধান্ত

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
07-10-2026 10:07:21 AM
শেষ ইচ্ছায় হবু বরের হৃদয়বিদারক সিদ্ধান্ত

আর মাত্র ১১ দিন পর বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল ২৫ বছর বয়সী বৃষ্টি ঘরামির। নতুন জীবন শুরুর স্বপ্নে তখন ব্যস্ত ছিল পুরো পরিবার। বিয়ের কেনাকাটা প্রায় শেষ। লাল শাড়ি, সিঁদুরসহ বিয়ের প্রয়োজনীয় সব আয়োজনও সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। বিয়ের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন বৃষ্টি।

বৃষ্টি ঘরামি গোপালগঞ্জের বাসিন্দা ছিলেন। জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকার শ্যামলীতে একটি ট্রমা সেন্টারে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মানুষের জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। অথচ নিয়তির নির্মম পরিহাসে নিজের জীবনই রক্ষা করা সম্ভব হলো না।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী ১৬ অক্টোবর বৃষ্টির বিয়ের দিন নির্ধারিত ছিল। অর্থাৎ বিয়ের মাত্র ১১ দিন আগে তার মৃত্যু হয়। কয়েক দিন আগেও বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে ছিল আনন্দের আমেজ। নতুন সংসারকে ঘিরে ছিল নানা পরিকল্পনা। কিন্তু হঠাৎ ডেঙ্গু সেই আনন্দকে পরিণত করল গভীর শোকে।

জানা গেছে, মৃত্যুর দিন সকালেও বৃষ্টির জন্য বি নেগেটিভ রক্তের প্রয়োজন ছিল। এ বিষয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রক্তের প্রয়োজনের কথা জানিয়ে পোস্ট করেছিলেন বলে জানা যায়। হয়তো তখনও তিনি এবং তাঁর স্বজনরা আশা করেছিলেন, চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

বৃষ্টির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। যে বাড়িতে কয়েক দিন পর বিয়ের আনন্দ-উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেখানেই শুরু হয় শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি। যে হাতে বিয়ের মেহেদি ওঠার কথা ছিল, সেই হাতই নিথর হয়ে পড়ে রইল।

তবে বৃষ্টির মৃত্যুর পর তাঁর হবু বর যে সিদ্ধান্ত নেন, তা উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। বৃষ্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মর্যাদা এবং তাঁদের অপূর্ণ ভালোবাসার স্মৃতি ধরে রাখতে পরিবারের সদস্যদের সামনে তিনি বৃষ্টির নিথর দেহে সিঁদুর পরিয়ে তাঁকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন।

মুহূর্তটি ছিল একই সঙ্গে ভালোবাসা, শোক ও অপূর্ণতার এক গভীর প্রতিচ্ছবি। যে সিঁদুর পরানোর কথা ছিল বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায়, আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে, সেই সিঁদুরই পরানো হলো জীবনের শেষ প্রান্তে। চারপাশে তখন ছিল না কোনো বিয়ের গান, ছিল না আনন্দের কোলাহল; ছিল শুধু স্বজনদের কান্না আর এক অপূর্ণ ভালোবাসার নিঃশব্দ সাক্ষ্য।

বৃষ্টির স্বপ্ন ছিল নতুন সংসার, ভালোবাসার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে নতুন জীবনে পথচলা। পরিবারেরও ছিল মেয়েকে ঘিরে অসংখ্য স্বপ্ন। বিয়ের পোশাক থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা—সবই প্রায় প্রস্তুত ছিল। কিন্তু একটি আকস্মিক অসুস্থতা মুহূর্তেই সব পরিকল্পনা থামিয়ে দিল।

জীবন কখনো কখনো কত নির্মমভাবে মানুষের পরিকল্পনাকে বদলে দেয়, বৃষ্টির গল্প যেন তারই এক বেদনাদায়ক উদাহরণ। মাত্র ২৫ বছরের একটি জীবন, সামনে ছিল অসংখ্য সম্ভাবনা। ছিল ভালোবাসা, ছিল বিয়ের আয়োজন, ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ আর দেখা হলো না তাঁর।

বৃষ্টির মৃত্যুর পর হবু বরের সেই শেষ সিদ্ধান্ত হয়তো কোনো অপূর্ণতাকে পূর্ণ করতে পারেনি, কিন্তু তাঁদের সম্পর্কের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের এক গভীর প্রকাশ হয়ে থাকবে। পরিবারের কাছে সিঁদুর পরানোর সেই মুহূর্তটি হয়ে থাকবে বেদনার এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি।

বিয়ের পিঁড়িতে বসা হলো না বৃষ্টির। লাল শাড়ি পরে নতুন জীবনে পা রাখা হলো না। তবে শেষ বিদায়ের আগে ভালোবাসার মানুষটির হাতে পাওয়া সেই সিঁদুর হয়তো তাঁর অপূর্ণ স্বপ্নেরই এক নীরব প্রতীক হয়ে রইল।

কখনো কখনো কিছু ভালোবাসার গল্প পূর্ণতা পায় না। তবুও সেই ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ে থেকে যায়—অশ্রুসিক্ত, নিঃশব্দ এবং চিরস্মরণীয় হয়ে। বৃষ্টি ঘরামির গল্পও হয়তো তেমনই এক অপূর্ণ ভালোবাসার গল্প, যেখানে বিয়ের আনন্দের বদলে শেষ হয়ে গেল একটি জীবনের অপেক্ষা, আর স্মৃতিতে রয়ে গেল সিঁদুর পরানোর সেই হৃদয়বিদারক মুহূর্ত।