ঢাকা, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬,
সময়: ০১:২৫:১৪ PM

এই বাজেট বাস্তবায়নে রয়েছে চ্যালেঞ্জ

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
12-06-2026 06:00:00 AM
এই  বাজেট বাস্তবায়নে রয়েছে চ্যালেঞ্জ

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ঘোষণা। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট ঘোষণাকে ঘিরে সিলেটে চলছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।বাজেট ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার (১১ জুন) নগরের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক কার্যালয়, সামাজিক সংগঠন ও পেশাজীবী মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
বিএনপি নেতারা সরকারের প্রথম বাজেটকে ‘গরিব মারার নয়, গরিব বাঁচানোর বাজেট’ হিসেবে দেখছেন। তারা এই বাজেটকে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী বলে অভিহিত করেছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে আরও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষ করে প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল সিলেটের ব্যবসায়ীরা জানান, জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও এবারের বাজেটে এই খাতের উন্নয়ন ও প্রণোদনা নিয়ে প্রত্যাশার তুলনায় কম আলোচনা হয়েছে।

একইসঙ্গে পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আরও কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও বাজেট নিয়ে চলছে আলোচনা। সরকারপক্ষ বাজেটকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নমুখী হিসেবে তুলে ধরছে।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, জনগণের প্রত্যাশা ও উন্নয়ন চাহিদার প্রতিফলন ঘটিয়ে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং দীর্ঘদিনের উন্নয়ন ঘাটতি দূর করার লক্ষ্যেই অবকাঠামো ও জনসেবামুখী খাতকে বাজেটে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তার মতে, বাজেটে ঘোষিত কর্মসূচি ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। জনগণের কল্যাণ এবং জীবনমান উন্নয়নই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য।

সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, এই বাজেটের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এটি দ্রব্যমূল্যের দাম স্থিতিশীল রাখার শতভাগ গ্যারান্টি দিচ্ছে। দেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা, যারা টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছে না, তাদের অবস্থার উন্নতি হবে। ক্যানসার রোগীদের ভোগান্তি সম্পর্কে সবাই জানে, তাদের চিকিৎসা খরচ কমবে। সিনিয়র সিটিজেনদের সুবিধা নিশ্চিত করছে এই বাজেট। এই বাজেট গরিব মারার নয়, গরিব বাঁচানোর বাজেট।

তবে বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। কারণ অতীতের অনেক বাজেটেই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে।

এ বিষয়ে সিলেট জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বিধ্বস্ত। এ অবস্থায় মহা বাজেট হয়েছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। আশা ছিল বাজেটে ট্যাক্স কমানো হবে। এখন দেখা যাচ্ছে, জনগণের ওপর ট্যাক্স বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সিলেট মহানগরের আহ্বায়ক আব্দুর রহমান আফজাল বলেন, বাংলাদেশের ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হলেও বাস্তবতার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় এই বাজেটের অনেক লক্ষ্য অর্জন কঠিন বলে প্রতীয়মান হয়।

বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ বাজেট ঘাটতি এবং সেই ঘাটতি পূরণে ঋণনির্ভরতার প্রবণতা দেশের অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে এই বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ২ দশমিক ৪৩ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতারা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কর কাঠামো সহজীকরণ, ব্যাংক ঋণের সুদের চাপ কমানো এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক গতি আসতে পারে।

সিলেট উইমেন চেম্বারের সভাপতি লুবানা ইয়ামিন শম্পা বলেন, আমরা যতটুকু দেখেছি, ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) জন্য উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দুটি ক্যাটাগরিতে প্রায় চারশ কোটি টাকার তহবিলের মধ্যে একটি খাতে দুইশ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টি আমরা দেখেছি। তবে বাজেট তখনই উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক হবে, যখন এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যাবে। শুধু বাজেট পাস হলেই হবে না, বরং মাঠপর্যায়ে এর সুফল পৌঁছাতে হবে।

তিনি বলেন, অনেক সময় বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহায়তা কর্মসূচি অনুমোদন পেলেও উদ্যোক্তারা ব্যাংকে গিয়ে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পান না। ফলে ঘোষিত সুবিধার পুরোটা কাজে লাগে না। তাই বাস্তবায়নের পরই বোঝা যাবে এই বাজেট কতটা উদ্যোক্তাবান্ধব হয়েছে।

লুবানা ইয়ামিন শম্পা আরও বলেন, কৃষিখাতের জন্য প্রতিবছরই বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সিলেট অঞ্চলের অনেক কৃষক ও উদ্যোক্তা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। বরাদ্দের বড় অংশ অন্য অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় চলে যায়। তাই বাজেটের সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে এই দিকেও সরকারের নজর দেওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যয় করা গেলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। একইসঙ্গে তারা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের কোষাধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম তুহিন বলেন, আমার কাছে এবারের বাজেটকে সময়োপযোগী, ব্যবসাবান্ধব এবং জনকল্যাণমুখী বাজেট বলে মনে হয়েছে। এ ধরনের একটি বাজেট প্রণয়নের জন্য আমি সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।

তিনি বলেন, বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে যে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, তা বিশেষভাবে আমার নজরে এসেছে। এসব খাতের উন্নয়ন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরও বলেন, বিলাসী ও অপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের ওপর কর বাড়ালেও সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে একদিকে রাজস্ব আহরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তার স্বার্থও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও উৎপাদনমুখী খাতের জন্য প্রণোদনা ও স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ৪ শতাংশ থেকে ৮-৯ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে বর্তমানে বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার প্রায় ১৪ শতাংশ। এটি নতুন উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা। সব মিলিয়ে এটি ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগ-সহায়ক বাজেট।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার (পোহাস) সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, আমি প্রথমেই সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। এবারের বাজেটে সুনির্দিষ্টভাবে হাওরাঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণে বিভিন্ন খাতে প্রায় দুই হাজার ৫শ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ইতিবাচক উদ্যোগ।

তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল। এর আগে আমরা হাওরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু অভিযোজন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিলের দাবি জানিয়েছিলাম। সে তুলনায় দুই হাজার ৫শকোটি টাকার বরাদ্দ সীমিত হলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।

তিনি আরও বলেন, ঘোষিত বরাদ্দের সঠিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকৃত উপকারভোগীরা যেন এর সুফল পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচিতে অনিয়ম ও তালিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে বাজেট নিয়ে সিলেটে আশাবাদ ও সংশয় দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই দেখা গেছে। অধিকাংশের মত, বাজেটের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষ এর সুফল পাবে।