ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ১০:২৮:২৫ PM

জাতিসংঘ থেকে বাংলাদেশের কূটনীতির নতুন বার্তা

মান্নান মারুফ
30-09-2026 09:09:51 PM
জাতিসংঘ থেকে বাংলাদেশের কূটনীতির নতুন বার্তা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ এবং চার দিনের নিউইয়র্ক সফরকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদ হলে বাংলায় দেওয়া ভাষণে তিনি গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, শান্তি, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরেন। 

এই সফরকে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, বিশ্বমঞ্চে একজন নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ ও দেশের মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সফরের বিভিন্ন কর্মসূচি ও বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, জনশক্তি, জলবায়ু, রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক শান্তির মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। 

একই পরিবারের তৃতীয় সদস্যের জাতিসংঘ ভাষণ
তারেক রহমানের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণকে পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাসের দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ফলে তারেক রহমানের ভাষণকে একই পরিবারের তৃতীয় সদস্যের জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে উপস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। 


তবে এবারের উপস্থিতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—বাংলাদেশের বর্তমান সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন। জাতিসংঘের নিজস্ব নথিতেও খলিলুর রহমানকে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাঁর নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মনোনয়নের বিষয়টি উঠে এসেছে। 


ভাষণে গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখা
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বাবলম্বী ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। 


দেশ পুনর্গঠনে সরকার ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’—অর্থাৎ থ্রি-আর কৌশলের কথা তুলে ধরেছে। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগে চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথাও ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। 


তার বক্তব্যে তরুণ প্রজন্ম, নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং সম্ভাবনা বিকাশের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে তরুণরা নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাবে এবং শিশুরা তাদের সম্ভাবনা বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ পাবে। 


রোহিঙ্গা সংকট ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ
নিউইয়র্ক সফরে রোহিঙ্গা সংকট ছিল বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির বক্তব্যেও ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সরাসরি সম্বোধন করার বিষয়টি দেখা যায়। 


এর পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় দেশগুলোর ঝুঁকি, জলবায়ু কার্যক্রম, ন্যায্য রূপান্তর এবং মা ও নবজাতকের মৃত্যু প্রতিরোধে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ধাত্রীসেবার সমন্বয় নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি, স্বাস্থ্য ও মানবিক সংকটের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।

বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক
চার দিনের সফরে তারেক রহমানের কর্মসূচির একটি বড় অংশজুড়ে ছিল দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠক। সরকারি ব্রিফিং অনুযায়ী, জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি, চারটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট এবং ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। 


তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচ, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এসব আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু স্থান পায়। 


এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের বিষয়টিও সরকারি সফরসূচিতে ছিল। 


বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্ব
নিউইয়র্ক সফরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কূটনীতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। জেপি মরগ্যান আয়োজিত ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের লক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়ানো, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ভিত্তি শক্তিশালী করা। মাহদী আমিন বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই সরকার এগোতে চায়।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’—সরকারের কূটনৈতিক বার্তা
প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সরকারি ব্রিফিংয়ে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই ধারণাটিকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। মাহদী আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পরিসরে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও বাংলাদেশের মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার কথা তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, তাঁর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্বশান্তি ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের ভূমিকার রূপরেখা দেওয়া।

জুবাইদা রহমানের অংশগ্রহণ
প্রধানমন্ত্রীর সফরের পাশাপাশি তাঁর সহধর্মিণী ও চিকিৎসক জুবাইদা রহমানও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, চার দিনে তিনি আটটি কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং তিনটিতে বক্তব্য দেন।

নারী নেতৃত্ব, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য এবং ধাত্রীসেবার মতো বিষয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সহধর্মিণীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত কর্মসূচিতেও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল।

সামনে বড় পরীক্ষা দেশের ভেতরে
নিউইয়র্ক সফর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করলেও সরকারের জন্য মূল পরীক্ষা এখন দেশের অভ্যন্তরে। জাতিসংঘের ভাষণে যে গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নই সরকারের কার্যকারিতা পরিমাপের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।

সরকার সাত মাসের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে উন্নয়নের দৃশ্যমান ফল দেখানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। তবে সেই ফল কতটা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হবে, অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল হবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে কতটা অগ্রগতি আসবে—তা নির্ভর করবে নীতি বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

জাতিসংঘ সফরের মাধ্যমে তারেক রহমান সরকার যে আন্তর্জাতিক বার্তা দিয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও বৈশ্বিক সহযোগিতা। এখন সেই বার্তাকে দেশের বাস্তব উন্নয়নে রূপান্তর করাই হবে সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী অধ্যায়।