ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন উত্তেজনা ও প্রত্যাশা তুঙ্গে, ঠিক তখনই নতুন করে আলোচনায় এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন—নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (এমপি) শপথবাক্য কে পাঠ করাবেন? সংবিধান অনুযায়ী সাধারণত সদ্যসমাপ্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার নতুন নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ করান। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই প্রচলিত বিধান কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি—বিশেষত প্রধান বিচারপতি—অথবা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) শপথ পাঠ করাতে পারেন কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা।
সংবিধানের বিধান ও বর্তমান বাস্তবতা
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে শপথ গ্রহণের বিধান উল্লেখ রয়েছে। ১৪৮(১) ও ১৪৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা স্পিকার অথবা তার মনোনীত ব্যক্তির মাধ্যমে শপথ গ্রহণ করেন। আবার ১৪৮(২ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্পিকার শপথ না পড়ালে নির্দিষ্ট শর্তে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ করাতে পারবেন। পাশাপাশি সংবিধানের তফসিল-৩-এ বিকল্প ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ আছে।
তবে চলমান পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কেউই কার্যকরভাবে দায়িত্বে নেই। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গত ২ সেপ্টেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। এর আগে আগস্ট মাসে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গ্রেপ্তার হন। ফলে সংবিধানের ৭৪(৬) অনুচ্ছেদে আগের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার বহাল থাকবেন—এই বিধান কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে—কে পাঠ করাবেন নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ?
আইন উপদেষ্টার ব্যাখ্যা: দুটি বিকল্প সামনে
এ বিষয়ে সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দুটি সাংবিধানিক বিকল্প খোলা রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ করানোর দায়িত্ব স্পিকারের। স্পিকার না থাকলে ডেপুটি স্পিকার। তবে তারা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে বিকল্প বিধান কার্যকর হবে।
তিনি জানান, “আমাদের আইনে আছে—স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার শপথ গ্রহণ করাতে না পারলে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি শপথ পাঠ করাতে পারবেন। প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনীত করতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে প্রধান বিচারপতির নাম আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, তিন দিনের মধ্যে শপথ না হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারও শপথ পাঠ করাতে পারবেন।”
ড. আসিফ নজরুল আরও বলেন, সরকার নির্বাচন-পরবর্তী সময় যত কম সম্ভব রাখতে চায়। তাই তিন দিন অপেক্ষার বিষয়টি এড়াতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তির মাধ্যমে শপথ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হতে পারে।
প্রধান বিচারপতির সম্ভাবনা
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জোবায়ের রহমান চৌধুরী-এর মাধ্যমে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজনের একটি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। ইতোমধ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ জানুয়ারি এ বিষয়ে মতামত চেয়ে আইন উপদেষ্টার কাছে নথি পাঠানো হয়। প্রয়োজনীয় আইনি যাচাই-বাছাই শেষে সারসংক্ষেপ আকারে প্রস্তাবটি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অনুমোদন দিলে তা রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে যাবে। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি হবে। সে ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতিই হবেন রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি।
ইসির অবস্থান: সিইসিও প্রস্তুত
এদিকে নির্বাচন কমিশনও তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াতে সক্ষম। ইসির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে স্পিকার বা তার মনোনীত কেউ শপথ পাঠ না করলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবেন। এ ছাড়া স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয়েই দায়িত্বে না থাকলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে সিইসি শপথ পাঠ করাতে পারেন।
তবে আইন উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার অপেক্ষা করতে চায় না। নির্বাচনের পর যত দ্রুত সম্ভব নতুন সংসদ কার্যকর করতে তারা আগ্রহী।
ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়সূচি
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষমতা হস্তান্তরও দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা ১৫ বা ১৬ ফেব্রুয়ারি নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন।
রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “সরকার সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে।” অর্থাৎ নির্বাচন, গেজেট প্রকাশ, শপথ এবং নতুন সরকার গঠন—সব প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সাংবিধানিকভাবে সংসদের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত। শপথ গ্রহণের পরই একজন সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ফলে শপথ অনুষ্ঠান বিলম্বিত হলে সংসদের কার্যক্রমও বিলম্বিত হতে পারে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতি এক ধরনের সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি করেছে। তবে সংবিধানে একাধিক বিকল্প ব্যবস্থা থাকায় সংকট নিরসনের পথ খোলা রয়েছে।
সরকারি সূত্র বলছে, সব বিকল্প পর্যালোচনা করে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও দ্রুত কার্যকর করা যায়—এমন পদ্ধতিই বেছে নেওয়া হবে।
সামনে কী?
এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে সরকারের নীতিগত অনুমোদন এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতির ওপর। প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে শপথ হলে তা হবে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তির বিধান অনুযায়ী। আর যদি তিন দিন অতিক্রান্ত হয় বা সরকার অন্য পথ বেছে নেয়, তবে সিইসি শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেন। সব মিলিয়ে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হয়ে উঠেছে এমপিদের শপথ অনুষ্ঠান। দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সাংবিধানিক বিধান অনুসরণের মাধ্যমে নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্ট মহলের।