১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়েছে। দৃশ্যমান সহিংসতার বড় কোনো ঘটনা সামনে না এলেও অনেক প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, তারা এমন মানসিক চাপ ও ধারাবাহিক অপপ্রচারের মুখে পড়েছেন, যা শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও কম নয়। রাজনৈতিক মহলে প্রায়ই শোনা যায়—কাউকে দীর্ঘদিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলা কখনও কখনও সরাসরি আঘাতের চেয়েও ভয়াবহ । এবারের নির্বাচনে সেই অদৃশ্য চাপই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
রাজধানীর ঢাকা-৮ আসনেও এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। এ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর থেকেই তাকে ঘিরে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার সমর্থক ও স্থানীয় কয়েকজন ভোটার। তাদের দাবি, গত দেড় থেকে দুই মাস ধরে তিনি ধারাবাহিক মানসিক চাপে ছিলেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে ঘায়েল করতে এমন কৌশল নিয়েছে, যা গুলি করে হত্যার চেয়েও ভয়াবহ মানসিক অভিঘাত তৈরি করেছে।
ঢাকা-৮ আসনের কয়েকজন সাধারণ ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচনী মাঠে তাকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন মন্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুৎসা রটনা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তীব্র ভাষ্য তার ওপর বড় ধরনের মানসিক প্রভাব ফেলেছিল। তাদের ভাষ্যমতে, একজন প্রার্থীর পক্ষে এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনী লড়াই চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়। প্রতিদিন নতুন করে অভিযোগ, আক্রমণ ও ব্যক্তিগত সমালোচনার মুখে প্রচারণা চালাতে গিয়ে তাকে বাড়তি চাপ সহ্য করতে হয়েছে।
স্থানীয় ভোটার রহিম উদ্দিন বলেন, “মির্জা আব্বাস তার রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই-উতরাই দেখেছেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তিনি যে পরিমাণ মানসিক চাপের মুখে পড়েছেন, তা আগে কখনও হয়নি। গত কয়েক মাসে তাকে উদ্দেশ্য করে হাজার হাজারবার ‘গডফাদার’ ও ‘চাঁদাবাজ’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এসব মন্তব্য পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে আমাদের ধারণা।” তার মতে, ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের আখ্যা দিয়ে একজন প্রার্থীকে সামাজিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এসব মন্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল তাকে রাজনৈতিকভাবে অপদস্থ করা এবং মানসিকভাবে ভেঙে ফেলা।
অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা ছিল সুসংগঠিত। নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়া তার ঘনিষ্ঠজনেরা দাবি করেন, বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও মন্তব্যের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ বারবার প্রচার করা হয়। তাদের মতে, সরাসরি হামলা বা আইনি লড়াইয়ে না গিয়ে একজন রাজনৈতিক নেতাকে বিপর্যস্ত করার এটি এক নতুন কৌশল—ধারাবাহিক মানসিক চাপ সৃষ্টি করে নির্বাচনী সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া।
করিম মুসুল্লি নামে আরেক ভোটার বলেন, “তার ধৈর্যের প্রশংসা করতেই হয়। শুধু রাজনৈতিক সমালোচনা নয়, ব্যক্তিগত আক্রমণও হয়েছে। নানা মিথ্যা কুৎসা রটানো হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষও বিভ্রান্ত হয়েছে। এর প্রভাব ভোটের ফলেও পড়েছে। তিনি বিজয়ী হলেও আগের তুলনায় কম ভোট পেয়েছেন বলে মনে করি।” তার মতে, একজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে লাগাতার নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হলে ভোটারদের একটি অংশ বিভ্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক।
নির্বাচনের পর দেওয়া বক্তব্যে মির্জা আব্বাস অভিযোগ করেন, তাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিপক্ষের লক্ষ্য ছিল তাকে শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবে আঘাত করা। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে এত অপপ্রচার হয়েছে যে উদ্দেশ্য ছিল আমাকে অসুস্থ করে তোলা এবং নির্বাচনী মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু আল্লাহর রহমত ও মানুষের দোয়া ছিল, তাই শেষ পর্যন্ত মাঠে টিকে থাকতে পেরেছি।” তার দাবি, রাজনৈতিক শক্তি ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই তাকে এ চাপ সামাল দিতে সহায়তা করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচনী রাজনীতিতে মানসিক চাপ সৃষ্টির কৌশল দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তৃত ব্যবহার এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। একজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হলে তা শুধু ব্যক্তিকে নয়, তার পরিবার, সমর্থক ও ভোটারদেরও প্রভাবিত করে। এতে নির্বাচনী ইস্যু থেকে মনোযোগ সরে গিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিতর্ক প্রাধান্য পায়।
ঢাকা-৮ আসনের ভোটারদের একটি অংশের মতে, নির্বাচনের আগে প্রায় প্রতিদিনই নতুন কোনো অভিযোগ বা মন্তব্য সামনে আসত। এতে উন্নয়ন, নাগরিক সুবিধা, অর্থনীতি বা স্থানীয় সমস্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যায়। প্রচারণার মূল আলোচ্য হয়ে ওঠে ব্যক্তি ও তার অতীত কর্মকাণ্ড। ফলে নীতি ও কর্মসূচিভিত্তিক বিতর্কের সুযোগ কমে যায়।
তবে প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানেই সমালোচনা থাকবে। রাজনৈতিক বক্তব্যকে অপপ্রচার হিসেবে চিহ্নিত করা সব সময় সঠিক নয়। তারা বলেন, প্রতিটি দলই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীর সমালোচনা করে—এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। ভোটারদের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে কে কতটা গ্রহণযোগ্য।
নির্বাচন-পরবর্তী পরিবেশে প্রশ্ন উঠেছে—মানসিক নির্যাতন বা ধারাবাহিক অপপ্রচারকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে। আইনগতভাবে শারীরিক হামলা সহজে চিহ্নিত করা গেলেও মানসিক চাপ বা অপপ্রচারের সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা কঠিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মন্তব্য বা অভিযোগের উৎস নির্ধারণও অনেক সময় জটিল হয়ে পড়ে। ফলে অভিযোগ থাকলেও তার প্রতিকার পাওয়া সহজ হয় না।
ঢাকা-৮ আসনের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতে নির্বাচনী আচরণবিধিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা ও ব্যক্তিগত আক্রমণ নিয়ে আরও স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল প্রচারণার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত।
মির্জা আব্বাসের সমর্থকদের মতে, নানা ষড়যন্ত্রের মধ্যেও তিনি নির্বাচনী মাঠ ছাড়েননি। তারা দাবি করেন, তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সংগঠনিক ভিত্তি ও সমর্থকদের সক্রিয় উপস্থিতিই তাকে শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, অভিযোগ-প্রতিআরোপ নির্বাচনী সংস্কৃতির অংশ এবং এটিকে একপাক্ষিকভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। তাদের মতে, নির্বাচনী প্রতিযোগিতা স্বাভাবিকভাবেই তীব্র হয়, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ আসনে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, এবারের নির্বাচন শুধু ভোটের লড়াই ছিল না; ছিল স্নায়ুযুদ্ধেরও এক অধ্যায়। দৃশ্যমান সহিংসতার বাইরে থেকেও মানসিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ঢাকা-৮ আসনের ঘটনাপ্রবাহ সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে এবং নির্বাচনী রাজনীতির নতুন বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা থেমে নেই। ভবিষ্যতে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা কি আরও নীতি ও কর্মসূচিভিত্তিক হবে, নাকি ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অপপ্রচারের সংস্কৃতি বিস্তৃত হবে—এ প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করতে হলে সহনশীলতা, দায়িত্বশীলতা ও তথ্যনির্ভর প্রচারণার ওপর জোর দেওয়ার বিকল্প নেই। ঢাকা-৮ আসনের অভিজ্ঞতা সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।