ঢাকা, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬,
সময়: ০৪:৫৯:৪৮ PM

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জয়ী ৪২ মুসলিম প্রার্থী

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
07-05-2026 09:02:34 PM
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জয়ী ৪২ মুসলিম প্রার্থী

পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র সামনে এসেছে। ২৯৪ সদস্যের বিধানসভায় মোট ৪২ জন মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্যের জনসংখ্যা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এবারের নির্বাচনেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কৌশল ও ফলাফলে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে।

নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি মুসলিম বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস থেকে। দলটি এবার মোট ৪৭ জন মুসলিম প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছিল। এর মধ্যে ৩১ জন জয়ী হয়ে বিধানসভায় জায়গা করে নিয়েছেন। তৃণমূল নেতৃত্ব শুরু থেকেই সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক ধরে রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। নির্বাচনী প্রচারণায় দলটি উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্পকে সামনে আনে। তারই প্রতিফলন দেখা গেছে ফলাফলেও।

অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবারের নির্বাচনে কোনো মুসলিম প্রার্থীকে টিকিট দেয়নি। ফলে দলটির পক্ষ থেকে কোনো মুসলিম বিধায়কও নির্বাচিত হননি। বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিজেপি তাদের প্রচারণায় মূলত হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রাধান্য দেওয়ায় মুসলিম প্রার্থী মনোনয়নের পথে হাঁটেনি। তবে বিরোধীরা অভিযোগ করেছে, এটি রাজ্যের বহুত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

জাতীয় কংগ্রেসও এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম প্রার্থী দেয়। দলটি মোট ৭০ জন মুসলিম প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলেও জয়ী হয়েছেন মাত্র দুইজন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও রাজ্যে ক্রমশ কমে আসা প্রভাবের কারণে কংগ্রেস প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি। একইভাবে বামফ্রন্ট ২৯ জন মুসলিম প্রার্থী দিলেও তাদের সাফল্য ছিল সীমিত। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মন্দা কাটিয়ে বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে মাত্র একজন মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।

ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটকে কেন্দ্র করে বিশেষ প্রচারণা চালায়। দলটি মোট ২৪ জন মুসলিম প্রার্থী দেয়। এর মধ্যে ভাঙড় আসনে নওশাদ সিদ্দিকী জয়লাভ করে আবারও আলোচনায় আসেন। ফুরফুরা শরীফের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে আইএসএফ সংখ্যালঘু ভোটে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালালেও রাজ্যজুড়ে বড় ধরনের সাফল্য পায়নি।

এবারের নির্বাচনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে তৃণমূলের বহিষ্কৃত নেতা হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বাধীন ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’। দলটি ৯০ জন মুসলিম প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়, যা ছিল মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যার দিক থেকে অন্যতম সর্বোচ্চ। যদিও অধিকাংশ প্রার্থী জয়ী হতে পারেননি, তবে দলের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির নিজে মুর্শিদাবাদের রেজিনগর ও নওদা—দুটি আসনেই জয় পেয়েছেন। পরে তিনি জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী একটি আসন ছেড়ে দেবেন এবং সেখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

গুরুত্বপূর্ণ জয়ী মুসলিম প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার আমডাঙা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত মোহাম্মদ সিদ্দিকী। তিনি ফুরফুরা শরীফ পরিবারের সদস্য হওয়ায় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দুই ক্ষেত্রেই তার প্রভাব রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম হেভিওয়েট নেতা ফিরহাদ হাকিম কলকাতা পোর্ট কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা পুরসভা ও রাজ্য রাজনীতিতে সক্রিয় ফিরহাদ হাকিম এবারও নিজের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

এছাড়া কসবা কেন্দ্র থেকে আহমেদ জাভেদ খান জয়ী হয়েছেন। তিনি রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী এবং তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে পরিচিত। উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ কেন্দ্র থেকে আলিফা আহমেদ জয়লাভ করেছেন। মালদহের মোথাবাড়ি থেকে নজরুল ইসলাম, দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাট থেকে শামীম আহমেদ এবং মুর্শিদাবাদের লালগোলা থেকে আব্দুল আজিজও তৃণমূলের টিকিটে জয়ী হয়েছেন।

এছাড়া জলঙ্গি কেন্দ্র থেকে বাবর আলী এবং হরিহরপাড়া থেকে নিয়ামত শেখ নির্বাচিত হয়ে বিধানসভায় যাচ্ছেন। এসব আসনে সংখ্যালঘু ভোটারদের বড় অংশ তৃণমূলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

অন্যদিকে, জাতীয় কংগ্রেসের হয়ে মুর্শিদাবাদের রানীনগর কেন্দ্র থেকে জুলফিকার আলী এবং ফারাক্কা কেন্দ্র থেকে মোহতাব শেখ জয়লাভ করেছেন। যদিও দলটির সামগ্রিক ফলাফল আশানুরূপ হয়নি, তবুও এই দুই আসনে কংগ্রেস নিজেদের উপস্থিতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে দীর্ঘ সময় পর মোস্তাফিজুর রহমানের জয়কে দলটির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাম রাজনীতির প্রভাব কমে গেলেও কিছু এলাকায় তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি এখনো টিকে আছে। একইভাবে আইএসএফের নওশাদ সিদ্দিকীর জয় সংখ্যালঘু রাজনীতিতে দলটির উপস্থিতি বজায় রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, রাজনৈতিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যের বহু আসনে মুসলিম ভোটাররা নির্ধারক ভূমিকা পালন করেন। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে বিশেষ কৌশল গ্রহণ করে থাকে।

সব মিলিয়ে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ৪২ জন মুসলিম বিধায়কের জয় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। তবে একইসঙ্গে বিভিন্ন দলের ভিন্ন অবস্থান ও নির্বাচনী কৌশলও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিজেপির পক্ষ থেকে কোনো মুসলিম প্রার্থী না দেওয়া এবং তৃণমূলের বিপুলসংখ্যক মুসলিম প্রার্থীর জয় রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।