ঢাকা, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
সময়: ১১:৫২:০৪ PM

তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি: বিচার ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি

মান্নান মারুফ
05-06-2026 11:52:04 PM
তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি: বিচার ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি

বাংলাদেশ বর্তমানে ডিজিটাল রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অবস্থান করছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, অনলাইন সেবা, স্মার্ট প্রশাসন এবং দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দেশের প্রায় সব খাতেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনের গতি এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি বলে মনে করেন দেশের অনেক সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে তরুণ সমাজ। তাদের মতে, ডিজিটাল যুগে বিচারপ্রার্থীদের বছরের পর বছর আদালতের দ্বারে ঘুরতে হওয়া একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অনেক আইনজ্ঞের ধারণা, বিচার ব্যবস্থার সংস্কার ও আধুনিকায়নের বিষয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নীতিনির্ধারকদের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাদের মতে, যদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণে ভূমিকা রাখেন, তবে বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘদিন আদালত প্রাঙ্গণে ঘুরতে থাকা এবং অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণের মতো সমস্যাগুলো অনেকাংশে কমে আসতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষ দ্রুত ও সহজে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ লাভ করবে বলে অনেক আইনজ্ঞ মনে করেন।

বর্তমানেও মামদাতার আমলের মত আদালতে একটি মামলার নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে মামলার শুনানি চলতে থাকে। ফলে বিচারপ্রার্থী ব্যক্তি শুধু মানসিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, অর্থনৈতিকভাবেও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন। বারবার আদালতে উপস্থিত হওয়া, আইনজীবীর খরচ বহন করা এবং কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হন।

তরুণদের ক্ষোভের কারণ
দেশের তরুণ সমাজ মনে করে, প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে বিচার ব্যবস্থার ধীরগতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একসময় যখন কাগজ-কলম এবং হাতের লেখার ওপর পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নির্ভরশীল ছিল, তখন মামলার দীর্ঘসূত্রতা কিছুটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যদি বিচার কার্যক্রম একই গতিতে চলে, তবে তা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হবে।

তরুণদের অভিযোগ, আদালতে অনেক সময় মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে শুধু নতুন তারিখ দেওয়া হয়। এতে মামলার মূল বিষয়ে অগ্রগতি না হয়ে সময়ই কেবল ব্যয় হয়। বিচারপ্রার্থীরা একের পর এক তারিখ পান, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বিচার পান না। এই পরিস্থিতি বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয় এবং হতাশা সৃষ্টি করে।

সময়ানুবর্তিতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা

বিচারপ্রার্থীদের অন্যতম অভিযোগ হলো আদালতের কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে শুরু না হওয়া। অনেক আদালতে বিচারক কখন এজলাসে উঠবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে দুপুর ১২টার দিকে বা মধ্যাহ্নভোজের পর কার্যক্রম শুরু হয়। ফলে সকাল থেকে আদালত প্রাঙ্গণে অপেক্ষা করতে হয় অসংখ্য মানুষকে।

এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু সময়ের অপচয়ই নয়, বিচারপ্রার্থীদের জন্য মানসিক চাপও সৃষ্টি করে। ডিজিটাল যুগে যেখানে প্রতিটি মিনিটের মূল্য রয়েছে, সেখানে বিচার ব্যবস্থায় এমন ধীরগতি ও অনিয়ম সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে।

গুরুতর অপরাধের বিচার দ্রুত হওয়া প্রয়োজন

ধর্ষণ, হত্যা, ডাকাতি, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ গুরুতর অপরাধের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এসব মামলার বিচার দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।মামলার বিচারের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেধে দেয়া। একই সঙ্গে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত না হলে সমাজে নেতিবাচক বার্তা যায়।

তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ মনে করে, কোনো ধর্ষণ মামলার আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পরও যদি মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর বিচার প্রক্রিয়া চলতে থাকে, তাহলে ন্যায়বিচারের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বিশেষ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা উচিত।

প্রযুক্তিনির্ভর বিচার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচার ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে হলে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ই-ফাইলিং, অনলাইন শুনানি, ডিজিটাল নথি সংরক্ষণ, স্বয়ংক্রিয় মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং আদালত ব্যবস্থাপনার আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করলে বিচার প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত ও স্বচ্ছ হতে পারে।

করোনাকালীন সময়ে ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে, তা আরও বিস্তৃতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার মামলার জট কমাতে, সময় বাঁচাতে এবং জনগণের ভোগান্তি হ্রাস করতে সহায়ক হতে পারে।

মামলার জট ও বিলম্বের কারণ

বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। আদালতে বিচারকের তুলনায় মামলার সংখ্যা অনেক বেশি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও জনবল সংকটও একটি বড় সমস্যা। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় সময় প্রার্থনা, সাক্ষী হাজির না হওয়া এবং অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতার কারণে মামলার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।

কিছু আইন বিশেষজ্ঞের মতে, অনেক সময় আইনজীবীদের একাংশ মক্কেল ধরে রাখার স্বার্থে মামলার কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করেন। যদিও এটি সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তবে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে আলোচিত। এ ধরনের অনৈতিক প্রবণতা বন্ধে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সরকারের করণীয়

বিচার ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রতিটি মামলার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, ডিজিটাল কোর্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, আদালতের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

এছাড়া আদালতের কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে শুরু এবং শেষ করার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। বিচার ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা গেলে জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ইকরামুল কবির বলেছেন, বিচার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করতে বিচারকদের কর্মঘন্টার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি মনে করেন, মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ দ্রুত সম্পন্ন করা, পুরোনো মামলাগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা এবং তদন্ত প্রতিবেদন এক থেকে তিন মাসের মধ্যে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হলে জনগণ দ্রুত ন্যায়বিচার পাবে এবং আদালতকেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের হয়রানি ও সময় অপচয় থেকে অনেকাংশে মুক্তি লাভ করবে।

একটি রাষ্ট্রের সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো কার্যকর বিচার ব্যবস্থা। বাংলাদেশ ডিজিটাল উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে চললেও বিচার ব্যবস্থায় এখনও কাঙ্ক্ষিত গতি ও আধুনিকতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি তরুণ সমাজও এই খাতের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ।

তরুণদের প্রত্যাশা হলো এমন একটি বিচার ব্যবস্থা, যেখানে মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত হবে, অযথা হয়রানি থাকবে না, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং ন্যায়বিচার পেতে মানুষকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না। সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক সংস্কার এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করা সম্ভব। এতে যেমন জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে, তেমনি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও আরও শক্তিশালী হবে।