পর্ব-৪
বাবার মৃত্যুর পর প্রথম শীতটা ছিল সবচেয়ে কঠিন। শীতের সকালের কুয়াশা যেন তাদের ঘরের ভেতরও নেমে এসেছিল। টিনের চালের ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকত। পুরোনো কম্বলটা চার ভাইবোন টেনে ভাগাভাগি করে নিত। শাহানা বেগম রাত জেগে সেলাই করতেন, তাই নিজের জন্য আলাদা কোনো কম্বল টেনে নিতেন না। সন্তানেরা ঘুমিয়ে পড়লে চুপচাপ তাদের গায়ে কম্বলটা আরও ভালো করে জড়িয়ে দিতেন।
তারপর জানালার পাশে বসে সুঁই-সুতা হাতে নিতেন।
চোখে ঘুম থাকত, হাতে ক্লান্তি থাকত, কিন্তু মন হার মানত না।
তিনি নিজেকে প্রতিদিন একটাই কথা বলতেন—
"আজকের দিনটা পার করতে পারলে, কাল হয়তো একটু ভালো হবে।"
ভোর সাড়ে পাঁচটা।
মসজিদের আজান শেষ হতেই শাহানা উঠে পড়তেন।
চুলায় ভাত বসিয়ে সন্তানদের জন্য ডাল আর আলুভর্তা বানাতেন।
রিফাতকে ডাকতেন।
— "বাবা, ওঠ। দোকানে যেতে হবে আবার কলেজেও যেতে হবে।"
রিফাত চোখ মুছতে মুছতে উঠে বসত।
কখনও তার ইচ্ছে করত, আর পাঁচটা ছেলের মতো একটু বেশি ঘুমাক।
কিন্তু সংসারের বাস্তবতা তাকে সেই সুযোগ দিত না।
মা হাসিমুখে বলতেন,
— "কষ্টটা আজকের। একদিন দেখবি, তুই নিজের পায়ে দাঁড়াবি।"
রিফাত কিছু বলত না।
শুধু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবত—
এই মানুষটা এত শক্তি কোথায় পায়?
খাওয়া শেষ করেই শাহানা বেরিয়ে পড়তেন।
প্রথম বাড়ি ছিল রেললাইনের পাশের এক দোতলা বাসা।
সেখানে তিনি ঝাড়ু দিতেন, মেঝে মুছতেন, বাসন ধুতেন।
বাড়ির গৃহকর্ত্রী মাঝে মাঝে বলতেন,
— "শাহানা, একটু তাড়াতাড়ি করো।"
তিনি শুধু মাথা নাড়তেন।
কখনও জবাব দিতেন না।
কারণ তিনি জানতেন, সম্মান হারালে কাজও হারাতে হবে।
সকাল শেষে আরেকটি বাড়ি।
তারপর আরেকটি।
দুপুরের রোদ মাথায় নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরতেন।
দুপুরের খাবার মুখে তুলেই আবার সেলাই মেশিনের সামনে বসতেন।
পুরোনো ব্লাউজ ছোট করা, পায়জামা সেলাই, স্কুল ড্রেসের ছেঁড়া অংশ জোড়া লাগানো—
যে কাজ আসত, তিনি ফিরিয়ে দিতেন না।
সুঁইয়ে সুতা ঢোকাতে ঢোকাতে অনেক সময় চোখ ঝাপসা হয়ে যেত।
তবু থামতেন না।
কারণ প্রতিটি সেলাইয়ের ফোঁড় যেন সন্তানের ভবিষ্যতের সঙ্গে জুড়ে ছিল।
একদিন সন্ধ্যায় চাল শেষ হয়ে গেল।
টিনের ড্রামে হাত ঢুকিয়ে শাহানা বুঝলেন, এক মুঠো চালও নেই।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
বাচ্চারা যাতে বুঝতে না পারে, তাই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেন।
কিন্তু রিফাত সব বুঝে ফেলেছিল।
সে আস্তে করে বলল,
— "মা, চাল নেই?"
শাহানা হেসে বললেন,
— "আছে বাবা, আমি নিয়ে আসছি।"
তিনি ওড়নাটা মাথায় দিয়ে পাশের মুদি দোকানে গেলেন।
দোকানদার কাদের মিয়া খাতাটা খুলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— "ভাবি, আগের বাকি এখনও শোধ হয়নি।"
শাহানা নিচু স্বরে বললেন,
— "আর একবার দেন। মাসের শেষে কিছু টাকা দেব।"
কাদের মিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর একটা ছোট বস্তায় চাল ভরে দিলেন।
— "শেষবার দিলাম।"
শাহানা মাথা নিচু করে বললেন,
— "আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুন।"
বাড়ি ফেরার পথে তিনি চোখের পানি লুকিয়েছিলেন।
সন্তানদের সামনে তিনি কখনও দুর্বল হতে চাননি।
রিফাত দোকানে কাজ শুরু করার কয়েক মাস পর সংসারে সামান্য স্বস্তি ফিরল।
মাস শেষে আট হাজার টাকা হাতে পেত।
টাকাটা এনে মায়ের হাতে তুলে দিত।
মা প্রতিবারই বলতেন,
— "কিছু নিজের জন্য রাখ।"
রিফাত হেসে বলত,
— "আমার নিজের বলতে তো তোমরাই।"
শাহানার বুকটা ভরে উঠত।
তিনি বুঝতেন, ছেলে সময়ের আগেই বড় হয়ে গেছে।
এদিকে বড় মেয়ে রিমিও বসে থাকেনি।
পাশের এলাকার দুটি বাচ্চাকে পড়ানো শুরু করল।
প্রথম মাসে মাত্র বারোশো টাকা পেল।
সেই টাকা দিয়ে সে মায়ের জন্য একটি সস্তায় শাড়ি কিনে আনল।
শাড়িটা হাতে নিয়ে শাহানা অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারলেন না।
তিনি শুধু মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
— "আমার জন্য কেন?"
রিমি মৃদু হেসে বলল,
— "তোমার পুরোনো শাড়িগুলো সব জায়গায় ছিঁড়ে গেছে।"
শাহানার চোখ ভিজে উঠল।
তিনি সেই শাড়িটা সঙ্গে সঙ্গে পরলেন না।
আলমারির ওপর যত্ন করে তুলে রাখলেন।
বললেন,
— "ঈদের দিন পরব।"
নীলা পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল।
প্রতিবেশীরা বলত,
— "মেয়েটা অনেক দূর যাবে।"
শাহানা গর্ব করে বলতেন,
— "আমার মেয়েরা সবাই মানুষ হবে।"
মুনা প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে মায়ের পাশে বসে গল্প করত।
— "মা, আমি ডাক্তার হলে তোমাকে আর কাজ করতে দেব না।"
শাহানা হেসে বলতেন,
— "আমি তখন শুধু নাতি-নাতনিদের নিয়ে খেলব।"
ঘরের ভেতর আবার হাসির শব্দ ফিরতে শুরু করল।
অভাব ছিল।
কিন্তু আশাও ছিল।
এক সন্ধ্যায় চারজন মিলে হিসাব করছিল।
রিফাত বলল,
— "মা, যদি আমরা আরেকটু টাকা জমাতে পারি, তাহলে ভাড়া বাড়ি ছেড়ে একটা ছোট জমি কিনব।"
রিমি বলল,
— "আমি টিউশনি বাড়াব।"
নীলা বলল,
— "আমিও আগামী বছর থেকে পড়াব।"
মুনা হাত তুলে বলল,
— "আমি টাকা জমাব আমার মাটির ব্যাংকে।"
সবাই হেসে উঠল।
শাহানা চুপচাপ সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
তার মনে হচ্ছিল—
এতদিন পরে হয়তো আল্লাহ তাদের দিকে তাকিয়েছেন।
দিনগুলো ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল।
সংসারে নিয়ম ফিরে এল।
বাজারের কিছু দেনা শোধ হলো।
রিফাত কলেজের পরীক্ষায় ভালো ফল করল।
রিমির ছাত্রছাত্রী বেড়ে গেল।
নীলা স্কুলে বৃত্তি পেল।
মুনা প্রতিদিন নতুন ছবি আঁকত।
ঘরের দেয়ালে সে একদিন একটা বাড়ির ছবি এঁকে লিখেছিল—
"আমাদের নতুন বাড়ি"
ছবির নিচে পাঁচজন মানুষ হাত ধরে দাঁড়িয়ে।
মাঝখানে মা।
সেদিন শাহানা ছবিটার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন।
কিন্তু সেই কান্না ছিল আনন্দের।
তবে সুখের দিন কখনও কখনও খুব নীরবে বিপদের ছায়াও সঙ্গে নিয়ে আসে।
শাহানা তা বুঝতে পারেননি।
একদিন বিকেলে তিনি সেলাইয়ের কাজ পৌঁছে দিতে পাশের মহল্লায় গেলেন।
ফিরে আসার সময় লক্ষ্য করলেন, রাস্তার ওপারে একজন অপরিচিত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
লোকটি স্থির চোখে তাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে।
শাহানা একবার তাকিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলেন।
ভাবলেন, হয়তো পথচারী।
কিছুক্ষণ পর ঘুরে দেখলেন, লোকটি এখনও একই জায়গায়।
তার চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা।
শাহানার বুকের ভেতর অকারণে কেমন যেন কেঁপে উঠল।
তিনি দ্রুত হাঁটলেন।
বাড়িতে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
কিছুক্ষণ পর জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন—
লোকটি ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে।
তিনি বিষয়টা আর গুরুত্ব দিলেন না।
সংসারের হাজার চিন্তার ভিড়ে এই ছোট্ট অস্বস্তিটা চাপা পড়ে গেল।
পরদিন রিফাত কাজে বেরিয়ে গেল।
রিমি টিউশনি পড়াতে গেল।
নীলা স্কুলে।
মুনা উঠোনে খেলছে।
শাহানা সেলাই মেশিন চালাচ্ছেন।
জানালার বাইরে কে যেন এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতর তাকিয়ে রইল।
তারপর আবার অদৃশ্য হয়ে গেল।
শাহানা শুধু পর্দাটা টেনে দিলেন।
নিজেকে বোঝালেন—
"হয়তো ভুল দেখছি।"
কিন্তু অদৃশ্য সেই দৃষ্টি যেন ঘরের চারপাশে নীরবে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
আর ঠিক তখনই, অচেনা এক মানুষের চোখ নিঃশব্দে আটকে গেল সেই ছোট্ট পরিবারের ওপর—একটি নজর, যার অর্থ তখনও কেউ বুঝতে পারেনি, কিন্তু যা তাদের শান্ত জীবনের ওপর ধীরে ধীরে দীর্ঘ এক অন্ধকার ছায়া ফেলতে শুরু করেছিল।
চলবে..........