ঢাকা, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:০৬:৩৫ AM

ব্রিগেডিয়ার শামসুল:নেতৃত্বের এক বিশ্বস্ত নাম

মান্নান মারুফ
21-06-2026 06:00:24 PM
ব্রিগেডিয়ার শামসুল:নেতৃত্বের এক বিশ্বস্ত নাম

বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) একেএম শামসুল ইসলাম একটি পরিচিত ও আলোচিত নাম। সেনাবাহিনীর একজন দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবনের পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে তাঁর ভূমিকা, শিক্ষাগত অর্জন এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সম্পৃক্ততা তাঁকে বিশেষভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। সামরিক জীবনে একেএম শামসুল ইসলামকে অনেক সহকর্মী ও পর্যবেক্ষক একজন পেশাদার, সৎ এবং নেতৃত্বগুণসম্পন্ন কর্মকর্তা হিসেবে মূল্যায়ন করেন। তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের ধরন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা তাঁকে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দেয় বলে সহকর্মীদের দাবি।

তাঁর পরিচিতির অন্যতম একটি অধ্যায় হলো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন। সে সময়ে তিনি কঙ্গোর মাহাগী অঞ্চলে একটি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষা ব্যাটালিয়নের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন সূত্র ও প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা, মানবিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। এমনকি সে সময় বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এমন সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল যে, মাহাগী অঞ্চলের কিছু স্থানীয় বাসিন্দা তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তাঁকে নিজেদের দেশের নেতৃত্বে দেখতে চেয়ে প্রতীকী কর্মসূচি পালন করেছিলেন। যদিও এই ঘটনার পরিসর ও প্রকৃতি নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে, তবে এটি তাঁর জনপ্রিয়তার আলোচনায় প্রায়ই উল্লেখ করা হয়।

শান্তিরক্ষা মিশন প্রসঙ্গে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছিলেন যে, বাংলাদেশি সেনাসদস্যরা শুধু পেশাগত দায়িত্বই পালন করেননি, বরং মানুষ হিসেবে, সেনা কর্মকর্তা হিসেবে এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী হিসেবে স্থানীয় জনগণের কাছে একটি ইতিবাচক উদাহরণ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্য শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশি বাহিনীর ভাবমূর্তি এবং মানবিক দায়িত্ববোধের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়।

শিক্ষাগত ক্ষেত্রেও একেএম শামসুল ইসলামের অর্জন উল্লেখযোগ্য। তিনি কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। সমর্থকদের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি উভয় পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। জানা যায়, শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও একেএম শামসুল ইসলামের অর্জন উল্লেখযোগ্য। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়া ফিলিপাইন ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে স্বর্ণপদক লাভের কৃতিত্বও তাঁর রয়েছে বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। উচ্চশিক্ষার ধারাবাহিকতায় তিনি নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন, যা তাঁর শিক্ষাগত ও পেশাগত প্রোফাইলকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

২০১৮ সালে তাঁর সামরিক চাকরির সমাপ্তি ঘটে। এ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যা রয়েছে। তাঁর সমর্থকরা দাবি করেন যে তিনি রাজনৈতিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, অন্যদিকে এ ধরনের বিষয় নিয়ে সরকারি অবস্থান ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যাও বিদ্যমান। ফলে বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে রয়েছে।

সামরিক জীবন শেষে একেএম শামসুল ইসলাম জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। পরবর্তীকালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার কারণে তিনি ধীরে ধীরে দলের নীতিনির্ধারণী পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আস্থাভাজন উপদেষ্টাদের একজন হিসেবে তাঁর নাম আলোচনায় আসে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা, কৌশলগত জ্ঞান এবং পেশাগত দক্ষতার কারণে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দেখা যাচ্ছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন।

সমর্থকদের মতে, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য কেবল পেশাগত দক্ষতাই নয়, নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের ধারণা, একেএম শামসুল ইসলাম এই দুই বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ঘটাতে পেরেছেন বলেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আলোচনায় ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছেন।

একই সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিত্ব, শৃঙ্খলাবোধ এবং পেশাগত সততার বিষয়টিও প্রায়ই আলোচনায় উঠে আসে। অনেক অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সেনা কর্মকর্তার মধ্যে তিনি সম্মানিত বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজন ও সমর্থকেরা দাবি করেন। তাঁদের মতে, তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম শক্তি ছিল অধস্তন ও সহকর্মীদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা এবং দায়িত্ব পালনে নৈতিক অবস্থান বজায় রাখা।

সব মিলিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) একেএম শামসুল ইসলাম বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিসরে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি দক্ষ নেতৃত্ব, সততা ও জনসম্পৃক্ততার প্রতীক; অন্যদিকে তাঁর কর্মজীবন ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে জনপরিসরে বিভিন্ন মত ও মূল্যায়নও বিদ্যমান। তবে এ বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও, তাঁর নাম যে বাংলাদেশের সামরিক ও জনজীবনের আলোচিত ব্যক্তিত্বদের মধ্যে একটি, সে বিষয়ে খুব কমই দ্বিধা রয়েছে।