পর্ব-৩
রাত গভীর।
চারদিকে মানুষের আনাগোনা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। উঠোনে আর আগের মতো কান্নার শব্দ নেই, কিন্তু নীরবতাটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে। ঘরের এক কোণে বসে আছে রিফাত। তার সামনে দেয়ালে ঝুলছে একটি পুরোনো ছবি।
ছবিটায় বাবা হাসছেন।
মুখভরা সরল হাসি।
কাঁধে সাদা গামছা।
চোখে অদ্ভুত এক নিশ্চিন্ততা।
রিফাত ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে অতীতের ভেতর হারিয়ে গেল, সে নিজেও বুঝতে পারল না।
পাঁচ বছর আগের এক বর্ষার সকাল।
সেদিনও আকাশ ভরা কালো মেঘ।
বৃষ্টি থামছিল, আবার শুরু হচ্ছিল।
টিনের চালের ওপর বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে ঘুম ভেঙেছিল ছোট্ট মুনার।
সে দৌড়ে বাবার কাছে এসে বলেছিল,
— "আব্বু, আজ আর বাইরে যেও না।"
কামাল হেসে মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন।
— "না গেলে তো আমার রাজকুমারীর জন্য বিস্কুট আনব কী দিয়ে?"
মুনা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— "বিস্কুট লাগবে না। তুমি থাকো।"
পাশ থেকে শাহানা বেগম বললেন,
— "আজ বৃষ্টি খুব। একটু কমলে যেও।"
কামাল জানালার বাইরে তাকালেন।
বৃষ্টির দিকে নয়, সংসারের দিকে।
চালের ড্রামে আর বেশি চাল নেই।
বাজারের খাতা বাকি।
বড় মেয়ের কলেজের ফি দিতে হবে।
রিফাতের বই কিনতে হবে।
ঘরে বসে থাকার মতো সামর্থ্য তার ছিল না।
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
— "আজ না গেলে কাল সবাই না খেয়ে থাকবে।"
এই কথার জবাব কারও কাছে ছিল না।
কামাল ছিলেন ফেরিওয়ালা।
কাঁধে হাঁড়ি-পাতিল, থালা, গ্লাস নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরতেন।
দিনে যত বিক্রি, সেই টাকাতেই চলত সংসার।
কখনও ভালো বিক্রি হতো।
কখনও একশ টাকাও হাতে আসত না।
তবু সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় তিনি কখনও খালি হাতে ফিরতেন না।
কখনও মুনার জন্য লজেন্স।
কখনও নীলার জন্য একটি খাতা।
কখনও রিমির জন্য চুল বাঁধার ফিতা।
আর রিফাতের জন্য পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে জোগাড় করা গল্পের বই।
তিনি বলতেন,
— "গরিবের ছেলে বলে স্বপ্ন ছোট হবে কেন?"
রিফাত তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত।
বাবার কথাগুলো তার কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
সেদিনও বের হওয়ার আগে কামাল ছেলেকে ডাকলেন।
— "রিফাত।"
— "জি, আব্বু।"
— "পড়াশোনা ছাড়বি না কখনও।"
— "না।"
— "আমি যতদিন আছি, তোদের পড়া বন্ধ হবে না।"
রিফাত হেসে বলেছিল,
— "আমি বড় হয়ে চাকরি করব। তখন তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না।"
কামাল ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন,
— "সেদিনের অপেক্ষাতেই তো আছি।"
সেদিন কেউ জানত না, সেই অপেক্ষা আর পূরণ হবে না।
বৃষ্টি তখনও থামেনি।
রাস্তা পিচ্ছিল।
কামাল গামছা দিয়ে মাথা ঢেকে বেরিয়ে গেলেন।
শাহানা অনেকক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
যতক্ষণ মানুষটাকে দেখা যায়।
তারপর দরজা বন্ধ করলেন।
মনের ভেতর অকারণ একটা অস্থিরতা।
কেন জানি আজ বারবার মনে হচ্ছিল, মানুষটাকে যেতে না বললেই হতো।
সকাল গড়িয়ে দুপুর।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
বৃষ্টি আরও বেড়েছে।
রিফাত বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।
— "মা, আব্বু এখনও এল না?"
— "আসবে।"
কিন্তু শাহানার নিজের গলাতেও ভরসা ছিল না।
ঠিক তখনই দরজায় জোরে কড়া নাড়ার শব্দ।
পাশের গ্রামের দুজন লোক।
তাদের মুখে অস্বাভাবিক গম্ভীরতা।
একজন কাঁপা গলায় বললেন,
— "ভাবি..."
শাহানার বুক কেঁপে উঠল।
— "কী হয়েছে?"
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— "চলুন... হাসপাতালে যেতে হবে।"
শাহানা আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারেননি।
তার হাত থেকে পানির গ্লাস পড়ে ভেঙে গেল।
সেদিনের হাসপাতালের করিডোরটা রিফাত এখনও ভুলতে পারেনি।
মানুষের ভিড়।
চোখের জল।
নীরবতা।
সবকিছু কেমন ঝাপসা।
তার মনে আছে শুধু একটা দৃশ্য।
মা হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলেন।
সেই কান্না যেন আজও তার কানে বাজে।
এক মুহূর্তে ভেঙে পড়েছিল তাদের পৃথিবী।
কামাল আর ফিরলেন না।
বাবার জানাজার দিন আকাশটাও কাঁদছিল।
টানা বৃষ্টি।
কবরস্থানের কাদা।
রিফাত নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার মনে হচ্ছিল, মানুষ কি সত্যিই এভাবে হঠাৎ চলে যায়?
সকালে যার সঙ্গে কথা হলো, সন্ধ্যায় সে শুধু স্মৃতি?
ছোট্ট মুনা কিছুই বুঝতে পারছিল না।
সে বারবার মাকে জিজ্ঞেস করছিল,
— "আব্বু কবে আসবে?"
কেউ উত্তর দিতে পারছিল না।
নীলা চুপচাপ মাটির দিকে তাকিয়ে ছিল।
রিমি মাকে ধরে রেখেছিল, যাতে তিনি অজ্ঞান হয়ে না পড়েন।
সেদিন প্রথমবার রিফাত বুঝেছিল—
একজন মানুষের মৃত্যু শুধু একজনকে নিয়ে যায় না, পুরো একটি সংসারের ভরসাকে নিয়ে যায়।
পরদিন থেকেই শুরু হলো নতুন যুদ্ধ।
ঘরে চাল নেই।
হাতে টাকা নেই।
বাজারের দেনা।
মানুষ সহানুভূতি দেখাল, কিন্তু সহানুভূতি দিয়ে সংসার চলে না।
শাহানা বেগম একদিন সকালে সন্তানদের সামনে বসে বললেন,
— "শোনো, কাঁদলে তোমাদের বাবা ফিরে আসবে না।"
চারজনই মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
তিনি চোখের জল মুছে বললেন,
— "এখন থেকে আমাকেই বাবা আর মা—দুইজন হতে হবে।"
রিফাত মৃদু স্বরে বলল,
— "আমি কাজ করব, মা।"
মা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লেন।
— "না। আগে পড়াশোনা।"
— "কিন্তু সংসার?"
— "সংসার আমি চালাব।"
সেই দিন থেকেই শাহানার সংগ্রাম শুরু।
ভোরে তিনি সেলাইয়ের কাজ নিতেন।
দুপুরে মানুষের বাসায় গিয়ে কাপড় কেটে দিতেন।
সন্ধ্যায় প্রতিবেশীদের শিশুদের পড়াতেন।
রাতে নিজের ঘরে বসে পুরোনো কাপড় মেরামত করতেন।
একেক দিন রাত দুইটা পর্যন্ত জেগে থাকতেন।
তারপর আবার ভোর।
একদিন রিমি বলল,
— "মা, আমি টিউশনি করব।"
মা বললেন,
— "করবি, কিন্তু পড়া ছাড়বি না।"
নীলা বলল,
— "আমিও সেলাই শিখব।"
মা হেসে বললেন,
— "শিখবি, কিন্তু আগে মানুষ হবি।"
মুনা ছোট্ট গলায় বলল,
— "আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব।"
শাহানা তাকে বুকে টেনে নিলেন।
— "হবি মা। অবশ্যই হবি।"
কয়েক মাস পর রিফাত কলেজে উঠল।
পড়াশোনার পাশাপাশি বিকেলে একটি দোকানে কাজ শুরু করল।
প্রথম মাসের বেতন হাতে পেয়ে সে সরাসরি মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল।
টাকাগুলো বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— "এগুলো রাখো।"
মা টাকা নিলেন না।
বরং ছেলের হাতটা ধরে বললেন,
— "এটা তোর প্রথম উপার্জন।"
রিফাত বলল,
— "তোমার জন্য।"
মা তখন আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
চোখ ভিজে গেল।
তিনি বুঝেছিলেন, ছোট্ট ছেলেটা অকালেই বড় হয়ে গেছে।
বছর গড়াতে লাগল।
অভাব রয়ে গেল।
কিন্তু সংসারে আশা ফিরতে শুরু করল।
রিমি কলেজে ভালো ফল করছিল।
নীলা স্কুলে প্রথম হতো।
মুনা প্রতিদিন নতুন নতুন স্বপ্ন আঁকত।
রিফাত সংসারের হাল ধরতে শিখছিল।
শাহানা মাঝে মাঝে চুপচাপ বসে সন্তানদের দেখতেন।
তার মনে হতো, এত কষ্ট যদি একদিন সার্থক হয়!
এক রাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল।
চার ভাইবোন মোমবাতির আলোয় পড়ছিল।
মা তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
হঠাৎ রিফাত বলল,
— "মা, তুমি এত কষ্ট করো কেন?"
শাহানা ধীরে ধীরে চারজনকে নিজের কাছে ডাকলেন।
এক এক করে তাদের মাথায় হাত রাখলেন।
তার কণ্ঠে ছিল ক্লান্তি, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল দৃঢ়তা।
তিনি বললেন,
"শোনো, জীবন যত কঠিনই হোক, তোমরা কেউ স্বপ্ন ছাড়বে না। অভাব মানুষকে ছোট করে না, হাল ছেড়ে দেওয়াই মানুষকে ছোট করে।"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি আরও বললেন,
"আমি বেঁচে থাকলে তোদের কাউকে না খেয়ে থাকতে দেব না।"
চার ভাইবোন তখন মাকে জড়িয়ে ধরেছিল।
কেউ জানত না, এই প্রতিশ্রুতিটাই একদিন রিফাতের স্মৃতিতে সবচেয়ে তীব্র আলো হয়ে জ্বলে থাকবে—একটি আলো, যা নিভে যাওয়ার পরও সারাজীবন তাকে পথ দেখাবে।
চলবে.......