ভারতে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন ও সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। সংগঠনটির প্রচার প্রধান সুনীল আম্বেকার বলেছেন, “এই দেশের সব মানুষের ডিএনএ এক।” তাঁর মতে, ধর্মীয় বিভেদ ও পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর করে দেশের সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সহাবস্থানের পরিবেশ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
পুনেতে এক সাংবাদিক সংগঠনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সুনীল আম্বেকার বলেন, আরএসএস প্রতিষ্ঠার আগেও ভারতে হিন্দু-মুসলিম উত্তেজনা ও সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। তাই এসব সমস্যার জন্য কেবল কোনো একটি সংগঠনকে দায়ী করা ঠিক নয়। বরং দীর্ঘদিনের এই বিভেদের ইতিহাসকে পেছনে ফেলে জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক সম্প্রীতির পথে এগিয়ে যাওয়াই হওয়া উচিত সবার লক্ষ্য।
তিনি বলেন, অতীতে মুসলিম সমাজের একটি অংশের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে ধর্ম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পরিচয়, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক শিকড়ও পরিবর্তিত হয়ে যায়। তাঁর দাবি, এই ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাভাবনাই ১৯৪৭ সালের দেশভাগের অন্যতম কারণ ছিল। তবে বর্তমান সময়ে সেই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে একসঙ্গে বসবাস করার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ভারতীয় মুসলমানদের প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে গিয়ে আম্বেকার বলেন, তাদের পাকিস্তানের দিকে না তাকিয়ে ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইন্দোনেশিয়ায় হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির ঐতিহাসিক প্রভাব এখনও দৃশ্যমান। দেশটির জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো সংঘাত নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, ধর্মীয় বৈচিত্র্যের মধ্যেও জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব, আর ইন্দোনেশিয়া তার একটি উদাহরণ।
জনসংখ্যা প্রসঙ্গে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের পূর্ববর্তী ‘তিন-সন্তান নীতি’ সংক্রান্ত মন্তব্য নিয়েও অনুষ্ঠানে প্রশ্ন ওঠে। এর জবাবে সুনীল আম্বেকার বলেন, আরএসএস জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে নয়; বরং জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, একটি পরিবারে কতজন সন্তান থাকবে, সে সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত এবং পরিবারের নিজস্ব বিষয়। এ ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা বা নির্দেশ আরএসএস সমর্থন করে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আরএসএসের আইনি মর্যাদা এবং সংগঠনের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নেরও জবাব দেন আম্বেকার। তিনি বলেন, আরএসএস একটি বৈধ ও নিবন্ধিত সামাজিক সংগঠন, যা দেশের আইন মেনেই কার্যক্রম পরিচালনা করে। সংগঠনের আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে তিনি জানান, সমস্ত অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয় এবং আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আরএসএস প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সুনীল আম্বেকারের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঐক্য, পারস্পরিক সম্মান এবং সামাজিক সম্প্রীতির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অতীতের বিভাজনমূলক চিন্তাধারা পরিহার করে একটি সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের আহ্বানও উঠে এসেছে।