ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৩:৩১:২২ AM

ইউসুফের নির্দেশেই চলছে মুদ্রণ অধিদপ্তর?

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
29-07-2026 01:03:46 PM
ইউসুফের নির্দেশেই চলছে মুদ্রণ অধিদপ্তর?

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) মুহাম্মদ ইউসুফ এবং বাংলাদেশ স্টেশনারি অফিসের উপপরিচালক (যুগ্মসচিব) ব্রেনজন চাম্বুগংয়ের বিরুদ্ধে সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে অনিয়ম, দরপত্রে প্রভাব বিস্তার এবং সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়া একটি অভিযোগপত্রে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্তের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, বসুন্ধরা পেপার মিলস লিমিটেড ব্যাংক-সংক্রান্ত দায়বদ্ধতার কারণে কয়েকটি সরকারি দরপত্রে অংশ নিতে না পারায় নতুন প্রতিষ্ঠান ‘বসুন্ধরা ফাইন পেপার’ নামে দরপত্রে অংশ নেয়। অভিযোগকারীর দাবি, সরকারি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও পুনরায় দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে প্রায় ৯ কোটি টাকার কার্যাদেশ ওই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় পরিচালক মুহাম্মদ ইউসুফকে সহযোগিতা করেছেন উপপরিচালক ব্রেনজন চাম্বুগং।

এছাড়া সিএন্ডএফ এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পরিচালকের পছন্দের প্রতিষ্ঠান প্রথম দফায় নির্বাচিত না হওয়ায় পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই অল্প সময়ের মধ্যে মূল্যায়ন সম্পন্ন করে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ না করলেও বিভিন্ন সরকারি ক্রয়কাজে নিয়মিত কার্যাদেশ পেয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করেই বিভিন্ন সরবরাহ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ডায়েরি, কলম, ডাস্টার, কাপড়, প্যালেটসহ বিভিন্ন পণ্য সরবরাহের কোটি কোটি টাকার কাজ নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি ডায়েরি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত নমুনা সংরক্ষণ করে তা কেবল একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেখানো হতো। ফলে বাজারদরের তুলনায় বেশি মূল্যে নিম্নমানের ডায়েরি সরবরাহ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।

বালাম বই মুদ্রণের জন্য প্রয়োজনীয় আইজিআর অ্যাজুরলেড কাগজ ক্রয়েও অতিরিক্ত পরিমাণ কাগজ উচ্চমূল্যে কেনার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, একই ধরনের কাগজ চলতি বছরের শুরুতে কম দামে কেনা হলেও পরবর্তীতে প্রায় ১৬ হাজার রিম কাগজ উল্লেখযোগ্য বেশি দামে ক্রয় করা হয়। এতে সরকারের প্রায় আড়াই কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

কার্টিজ কাগজ ক্রয়ের ক্ষেত্রেও দরপত্রের শর্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, দরপত্রের শর্ত সংশোধনের মাধ্যমে মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ স্টেশনারি অফিসের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দলিল লেখার কাগজ ক্রয় নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মজুত মালামাল পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই শেষে দাখিল করা এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, একটি মাত্র পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের যোগসাজশের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে পরিচালক মুহাম্মদ ইউসুফের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়, তিনি পূর্বে দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়িত্ব পালনকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদ্মা সেতু প্রকল্প ও তৎকালীন সরকারের পক্ষে বিভিন্ন মন্তব্য করেছিলেন। অভিযোগকারীরা এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

তবে অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন পরিচালক (যুগ্মসচিব) মুহাম্মদ ইউসুফ। তিনি বলেন, “সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার কারণে আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।”

অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে উপপরিচালক ব্রেনজন চাম্বুগংয়ের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, নিয়ম অনুযায়ী পরিচালকের বিরুদ্ধে তাঁর অধীনস্থ কর্মকর্তা দিয়ে তদন্ত করা সম্ভব নয়। এছাড়া অভিযোগকারীর পরিচয় স্পষ্ট না হওয়ায় কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, গত ২১ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-২ মো. আশরাফুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ৩০ জুন মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।