রাজধানীর আবদুল গনি রোডের শিক্ষা ভবনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অতীতে যে দুর্নীতির আলোচনা একটি নির্দিষ্ট ভবনকেন্দ্রিক ছিল, বর্তমানে তা সারাদেশের শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষক-কর্মচারীদের বদলি, পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে একটি শক্তিশালী দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি।
অভিযোগ রয়েছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) কেন্দ্র করে বদলি বাণিজ্যের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যস্থতাকারী এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন পদে নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষা ক্যাডারের অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলেও তারা জানান।
অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে একটি আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে এসব যোগাযোগ পরিচালিত হয়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীদের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
সূত্রের দাবি, মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ—দুই পর্যায়ের জন্য আলাদা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। এসব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বদলি ও পদায়নের আবেদন সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসবে।
বদলি নিয়ে অভিযোগ ও বিরোধ
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কখনো কখনো অর্থ লেনদেনের পরও প্রত্যাশিত বদলি বা পদায়ন না হওয়ায় বিরোধ তৈরি হয়। কিছু ব্যক্তি দাবি করেছেন, অগ্রিম অর্থ দেওয়ার পরও কাজ সম্পন্ন না হওয়া এবং অর্থ ফেরত না দেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ ও অভিযোগ জানানোর ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
একটি অভিযোগের বিষয়ে বলা হয়েছে, একজন শিক্ষা কর্মকর্তার বদলি সংক্রান্ত বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগকারী পক্ষ দাবি করেছে। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও পক্ষগুলোর বক্তব্য প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষা প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারের জন্য বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং সুপারিশ ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নিয়মনীতি অনুসরণ করা জরুরি।
দালালচক্র ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ
শিক্ষা ভবনকেন্দ্রিক বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে মাঝেমধ্যেই দালালচক্রের নাম উঠে আসে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বাইরের ব্যক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করে বদলি-পদায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কোনো ব্যাংক হিসাব বা লেনদেনের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
তারা আরও দাবি করেছেন, বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, প্রকাশ্য নীতিমালা এবং নিয়মিত অডিট ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার। এতে অনিয়মের সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন তারা।
শিক্ষা প্রশাসনে জবাবদিহিতার প্রশ্ন
শিক্ষা খাত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত। এখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকরা মনে করেন, বদলি ও পদায়ন যদি যোগ্যতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে না হয়ে অন্য কোনো প্রভাবের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা প্রশাসনে যেকোনো ধরনের দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্টদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
শিক্ষা খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, নিয়মের প্রয়োগ এবং কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।