ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) নিয়োগ, চাকরি স্থায়ীকরণ, পদায়ন ও বদলি ঘিরে আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংস্থাটির সচিব মো. মশিউর রহমান খানের বিরুদ্ধে। ফাইল আটকে রেখে ঘুষ দাবি, চাকরি স্থায়ীকরণ ও পুনর্বাসনের নামে অর্থ আদায় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে সংস্থাটির অভ্যন্তরে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
চাকরি স্থায়ীকরণে কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ডিএসসিসিতে সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মশিউর রহমান প্রশাসনিক কার্যক্রমে নিজস্ব বলয় গড়ে তোলেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির মতো নিয়মিত প্রক্রিয়ায় অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কিছু প্রশাসনিক ফাইল আটকে রেখে অর্থ দাবি করার অভিযোগও সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ৬০ জন অফিস সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটরের চাকরি স্থায়ীকরণের বিনিময়ে জনপ্রতি তিন লাখ টাকা করে মোট এক কোটি ৮০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। একইভাবে ২৬ জন কার্যসহকারীর চাকরি স্থায়ীকরণে জনপ্রতি দুই লাখ টাকা করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব লেনদেনের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি বা সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া না গেলে অভিযোগগুলো নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এ ছাড়া অতীতে চাকরিচ্যুত কিছু কর্মচারীকে পুনর্বহাল এবং পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পুনর্বহালের জন্য জনপ্রতি দুই থেকে তিন লাখ টাকা এবং সুবিধাজনক পদায়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে।
চলতি দায়িত্ব বণ্টনেও অনিয়মের অভিযোগ
ডিএসসিসির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে নির্বাহী প্রকৌশলীদের অধীন গুরুত্বপূর্ণ পদে জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক বিধিমালা উপেক্ষা করে পছন্দের জুনিয়র কর্মকর্তাদের চলতি দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।
অতীতের কর্মস্থল নিয়েও প্রশ্ন
মশিউর রহমান খানের অতীতের কর্মস্থলগুলোতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পাবনায় দায়িত্ব পালনকালে রাজস্ব আদায়, সার্টিফিকেট মামলা নিষ্পত্তি ও বাণিজ্যিক লাইসেন্স প্রদান; কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে খাসজমি ও অর্পিত সম্পত্তি বন্দোবস্ত; এবং সুনামগঞ্জের শাল্লা ও কিশোরগঞ্জের ইটনায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে হাটবাজার ইজারা, খাদ্য মন্ত্রণালয়ে খাদ্যশস্য সংগ্রহ, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লাইসেন্স-সংক্রান্ত কার্যক্রম এবং অন্যান্য সংস্থায় কেনাকাটা ও ঠিকাদারি বিল অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্ত আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পদোন্নতি নিয়ে আলোচনা
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও তোলা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি না পাওয়া এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উপসচিব পদে পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তবে পদোন্নতির প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ ও বিভাগীয় নথি যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
ডিএসসিসির সাম্প্রতিক সময়ে সম্পন্ন ও প্রক্রিয়াধীন চাকরি স্থায়ীকরণ, কর্মচারীদের পুনর্বহাল এবং উন্নয়ন প্রকল্পে চলতি দায়িত্ব বণ্টনের নথি পর্যালোচনার দাবি উঠেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করার সুপারিশ করেছেন অভিযোগকারীরা।
একই সঙ্গে মশিউর রহমান খান, তাঁর স্ত্রী পলি আহমেদ এবং কথিত মধ্যস্থতাকারীদের সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে ওঠা অভিযোগও আইনানুগ প্রক্রিয়ায় যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে মশিউর রহমান খান ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্টদের সম্মান ও অধিকার সুরক্ষিত রাখাই হবে ন্যায়সংগত পদক্ষেপ।