ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৩:৫৮:৩৫ AM

জিম্মি ওষুধ খাত, প্রশ্নের মুখে প্রশাসন

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
19-10-2026 09:09:14 PM
জিম্মি ওষুধ খাত, প্রশ্নের মুখে প্রশাসন

দেশের কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিত করার দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার এক কর্মকর্তাকে ঘিরে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ ও পদায়ন বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের নানা অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর কারণে সংস্থাটির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের প্রধান দায়িত্ব হলো দেশের বাজারে নিরাপদ, কার্যকর ও মানসম্মত ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। তবে সংস্থাটির অভ্যন্তরে অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র। তাদের অভিযোগ, ২০১২ সালে চাকরিতে যোগদানের পর থেকে উপপরিচালক সৈকত কুমার কর দীর্ঘ সময় ধরে অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়কেন্দ্রিক দায়িত্ব পালন করে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছেন। প্রশাসনিক পরিবর্তন ও বদলির বিভিন্ন পরিস্থিতিতেও তার অবস্থান অপরিবর্তিত থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে প্রভাবশালী একটি বলয়ের কারণে জেলা পর্যায়ের কিছু যোগ্য কর্মকর্তা কাঙ্ক্ষিত পদায়ন ও প্রশিক্ষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে, সৈকত কুমার কর একাধিকবার বিদেশে প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ন্যাশনাল ড্রাগ কন্ট্রোল ল্যাবরেটরি (এনডিসিএল) ৭৭টি ওষুধকে মানহীন হিসেবে চিহ্নিত করে। জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এসব ওষুধের উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাবশালী কিছু ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বাইরে থেকে গেছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও গৃহীত পদক্ষেপ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ওষুধ আমদানির অনুমোদন ও অনাপত্তিপত্র (এনওসি) প্রদান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ফুড সাপ্লিমেন্ট ও নিউট্রিশনাল সাপ্লিমেন্ট আমদানির ক্ষেত্রে নিবন্ধনবিহীন পণ্যের অনুকূলে অনাপত্তিপত্র দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এ ছাড়া অ্যালোপ্যাথিক ও ইউনানি ওষুধের উৎপাদন লাইসেন্স, মোড়ক অনুমোদন, ওষুধের মূল্য নির্ধারণ, মেডিকেল ডিভাইস নিবন্ধন, কাঁচামালের উৎস যাচাই এবং আমদানি অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ফাইল আটকে রেখে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সৈকত কুমার করের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি, অনুমোদনপ্রক্রিয়া ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা জরুরি।

নিয়োগ ও পদায়ন বাণিজ্য নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করেছেন সংস্থাটির অভ্যন্তরের কয়েকটি সূত্র। তাদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে বদলি কিংবা পছন্দের জায়গায় পদায়নের জন্য অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের ৩ জুন প্রকাশিত ৭৪ জনের একটি নিয়োগ আদেশকে কেন্দ্র করেও অনিয়ম, জালিয়াতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে কয়েকজন প্রার্থীর চাকরি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সৈকত কুমার কর ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিয়োগসংক্রান্ত নথি, মেধাতালিকা, অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

এদিকে, সৈকত কুমার করের নামে ও নিকটাত্মীয়দের নামে রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, জমি ও নগদ অর্থসহ বিপুল সম্পদ থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। তার জন্মস্থান কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলার দাবিও করেছেন অভিযোগকারীরা। এসব সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য নথি ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হলে সম্পদের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ, লাইসেন্স প্রদান ও বাজার তদারকির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা ও মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে অনিয়ম ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।