ঢাকা, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৫:০১:০৫ AM

বিএনপির সামনে কূটনীতিসহ বহুমুখী চ্যালেঞ্জ

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
15-02-2026 08:32:34 PM
বিএনপির সামনে কূটনীতিসহ বহুমুখী চ্যালেঞ্জ

নতুন সরকারের শপথের মাধ্যমে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় ফিরেই দলটিকে একাধিক জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারত-এর সঙ্গে মরচে ধরা সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করা, যুক্তরাষ্ট্র-এর অনিশ্চিত নীতি সামাল দেওয়া এবং দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা হবে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার। বিশ্লেষকদের মতে, একপেশে ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ব্যর্থ পররাষ্ট্রনীতির অধ্যায় পেরিয়ে বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতা নিচ্ছে। এ অবস্থায় সুসংগত কূটনৈতিক কৌশল ও কার্যকর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নই হবে সময়ের দাবি—যাতে দেশের স্বার্থ সর্বোচ্চভাবে সুরক্ষিত থাকে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার পররাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেনি। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছিল। তবে বেশিরভাগ সহযোগী দেশের সঙ্গে পূর্ববর্তী যোগাযোগ থাকায় নতুন সরকারকে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না। তাঁর মতে, ভারসাম্যপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ ও বাস্তবমুখী কূটনীতি অনুসরণ করলে বড় সংকট এড়ানো সম্ভব।

অর্থনীতি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক মনে করেন, নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। তাঁর ভাষায়, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ এখন জরুরি। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার করতে হবে।

তিনি বলেন, অর্থনীতি শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা এবং একটি সুস্পষ্ট কৌশল নির্ধারণ করা। একক ব্যক্তি বা একক মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া এখন আর কার্যকর নয়; বরং বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবন

মুন্সি ফয়েজ আহমেদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় তলানিতে পৌঁছেছিল। সেটিকে পুনরুজ্জীবিত করা নতুন সরকারের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তবে তিনি মনে করেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মানে তাদের সব দাবি মেনে নেওয়া নয়; বরং পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া।

নির্বাচনের আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এসে তারেক রহমান-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নির্বাচনে জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শুভেচ্ছা জানান এবং সহযোগিতার অঙ্গীকার করেন। এসব ঘটনাকে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

ফয়েজ আহমেদের মতে, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ও অন্যান্য ইস্যুতে বাংলাদেশের ন্যায্য উদ্বেগ স্বীকৃতি পেলে অনেক জটিলতা সহজেই দূর হতে পারে। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারেও পদ্মা ও তিস্তা নদীর পানিবণ্টন ইস্যু আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলা হয়েছে।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বলেছেন, দেশের স্বার্থ ও জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করা হবে। স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও জানিয়েছেন, কোনো একক দেশের প্রতি আনুগত্য নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে।

পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা ও বহুমুখী কূটনীতি

অধ্যাপক ওবায়দুল হক বলেন, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার বাইরে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থাও বড় চ্যালেঞ্জ। ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট নতুন আন্তর্জাতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। প্রচলিত ‘রুলস-বেজড অর্ডার’ দুর্বল হচ্ছে; সম্পর্কগুলো আরও বেশি লেনদেননির্ভর হয়ে উঠছে।

তিনি মনে করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তির নতুন ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশকে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র প্রসঙ্গে মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের নীতি অনেক ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত। ফলে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা জরুরি। তবে সম্পর্ক কেবল রাষ্ট্রপ্রধানের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বিভিন্ন স্তরে সংলাপ ও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে, সেগুলো কাজে লাগাতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ অবস্থায় না থাকলেও নতুন সরকারকে সেগুলোতে নতুন গতি আনতে হবে। সব মিলিয়ে, বিএনপি সরকারের সামনে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—যার সফল মোকাবিলাই নির্ধারণ করবে আগামীর পথরেখা।