ঢাকা, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ১০:০৯:০১ PM

বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া হকার উচ্ছেদ:‘বুমেরাং’ হওয়ার আশঙ্কা

মান্নান মারুফ
06-04-2026 08:18:22 PM
বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া হকার উচ্ছেদ:‘বুমেরাং’ হওয়ার আশঙ্কা

রাজধানী ঢাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে হকার উচ্ছেদ অভিযান নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কোনো সুস্পষ্ট পুনর্বাসন পরিকল্পনা বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছাড়া হকার উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়ে নানা মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ, সমাজ বিশ্লেষক এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি  বড় অংশ মনে করছেন, এমন সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকারের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। সরকার পড়তে পারে কঠিন সমস্যায়।

ঢাকায় আনুমানিক পাঁচ লাখ হকার জীবিকা নির্বাহ করেন ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে। এদের অধিকাংশই নিম্নআয়ের মানুষ, যাদের জন্য এই ব্যবসাই একমাত্র আয়ের উৎস। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পাঁচ লাখ হকারের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। অর্থাৎ, হকার উচ্ছেদ শুধু পাঁচ লাখ মানুষের নয়, বরং তাদের পরিবারসহ বৃহত্তর একটি জনগোষ্ঠীর জীবিকায় সরাসরি আঘাত হানতে পারে। এর ফলে শুধু রাজধানী ঢাকাই নয়  এর ফলে সারাদেশেই খারাপ পরিবেশ তৈরী হতে পারে। সারাদেশের শহড়ের হকা র উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা করলে দেশে প্রায়  এক কোটি লোক বেকার হবে। এবং এর ফলে বেকায়দায় পড়বে আড়াই কোটিরও বেশি মানুষ।

বিশ্লেষকদের মতে, হকারদের হঠাৎ উচ্ছেদ করলে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়বেন। বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় এই বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেতে পারে। এর ফলে সামাজিক অপরাধ যেমন ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদির ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।

একজন অর্থনীতিবিদের ভাষায়, “ফুটপাতের হকাররা শহরের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা শুধু নিজেরাই আয় করেন না, বরং সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে আরও অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন। এই খাতকে একেবারে ধ্বংস করে দিলে তার বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অনেক সেক্টরে।”

বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই সিদ্ধান্তকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। উৎপাদন খাতে ধীরগতি, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেনের চাপ অর্থনীতিকে দুর্বল করে তোলে। এর মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাম্প্রতিক জনতার রোষানোলে পড়ে সরকারের হটাৎ পতনসহ বিভিন্ন ঘটনাবলিও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি অস্থির অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জনগণের জীবিকা সংকুচিত করার মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। বিশেষ করে, যেসব জনগোষ্ঠী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও নীরব অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। দলটির কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বাস্তবতা বিবেচনা করা উচিত ছিল দায়িত্বশীলদের। তাদের মতে, “একদিকে অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে হকার উচ্ছেদ—এই দুইয়ের সমন্বয় জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।”

তারা আরও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “যদি পাঁচ লাখ হকারের আয় বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।”

এদিকে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বর্তমানে বেশ অস্থির। বৈশ্বিক রাজনীতিতে উত্তেজনা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে উঠতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন সময়ে হকারদের মতো একটি বড় অনানুষ্ঠানিক খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের একটি অংশ বলছেন, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা অবশ্যই প্রয়োজন। রাজধানী ঢাকার যানজট মুক্ত ও ফুটপাতে পথচারীদের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে এবং শহরের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হকারদের নিয়ন্ত্রণ জরুরি। কিন্তু তারা জোর দিয়ে বলছেন, এই প্রক্রিয়া অবশ্যই পরিকল্পিত ও মানবিক হতে হবে। তানা হলে পরিস্থিতি হবে আরো ভয়াবহ।

একজন নগর পরিকল্পনাবিদের মতে, “হকার উচ্ছেদ নয়, বরং পুনর্বাসনই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। নির্দিষ্ট জায়গায় হকারদের জন্য বাজার বা স্টল তৈরি করে তাদের সেখানে স্থানান্তর করা যেতে পারে। এতে যেমন শহরের শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, তেমনি হকাররাও জীবিকা হারাবে না।”

বিশ্লেষকরা আরও বলেন, উন্নত বিশ্বের অনেক শহরে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট জোন বা এলাকা নির্ধারণ করা হয়, যেখানে তারা নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে পারেন। বাংলাদেশেও এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে সমস্যার একটি টেকসই সমাধান পাওয়া যেতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া হকার উচ্ছেদের সিদ্ধান্তকে অনেকেই অদূরদর্শী হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে বিএনপি তথা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে।

সরকারের উচিত হবে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা। হকারদের পুনর্বাসন, ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা, প্রশিক্ষণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি—এসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

শেষ পর্যন্ত, একটি দেশের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষ পায়। তাই নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—শহরের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে লাখো মানুষের জীবিকা সুরক্ষিত রাখা।