ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:১৩:২৩ AM

৩০০ কোটির সরকারি প্লট বেহাতে রহস্যজনক নীরবতা

ষ্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
29-06-2026 04:43:17 PM
৩০০ কোটির সরকারি প্লট বেহাতে রহস্যজনক নীরবতা

সরকারি জমি, প্লট বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোনো মামলায় আদালতের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সরকারের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়াই প্রচলিত রীতি। সাধারণত নিম্ন আদালত বা হাইকোর্টে সরকার পরাজিত হলে আপিল বিভাগে আপিল করা হয় এবং প্রয়োজন হলে রিভিউ আবেদনও করা হয়। এমনকি রিভিউ নিষ্পত্তির পরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার ভোগদখল সংক্রান্ত নতুন মামলা করে সম্পত্তির হস্তান্তর ঠেকিয়ে রাখার নজির রয়েছে। রাজউক ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক মামলায় অতীতে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু গুলশানের সিইএন (সি) ব্লকের ৯৮ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর প্লটের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। মন্ত্রণালয়ের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭৬ সালে হাইকোর্টের একটি রিট মামলায় সরকারের বিপক্ষে রায় হওয়ার পর সরকার, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কিংবা রাজউক—কোনো পক্ষই আপিল করেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং রহস্যজনক সিদ্ধান্ত।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, মামলার বাদীও পরবর্তী সময়ে আদালতের মাধ্যমে রায় বাস্তবায়ন, প্লট বুঝে নেওয়া কিংবা আদালত অবমাননার মামলা দায়েরের মতো কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নতুন করে আদালতে বিষয়টি উঠলে প্রকৃত নথিপত্র প্রকাশিত হওয়ার আশঙ্কায় একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন প্রশাসনিক তদবির ও গোপন সমঝোতার মাধ্যমে প্লটটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩ সালের জুন মাসে তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ না করেই প্লটটি বেসরকারি মালিকানায় হস্তান্তরের লক্ষ্যে রাজউককে অনুশাসন দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বিষয়টি তিনি তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীকে না জানিয়ে নিজেই অনুমোদন দেন এবং গোপনে চিঠি জারি করেন। অথচ এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে হওয়ার কথা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

পরে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে সংশ্লিষ্ট নথি তলব করেন। প্রথমে নথি খুঁজে পাওয়া না গেলেও পরে সচিবের ব্যক্তিগত তালাবদ্ধ আলমারি থেকে তা উদ্ধার করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ঘটনায় আরও অভিযোগ ওঠে যে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি ও একটি ভূমিদস্যু চক্র নেপথ্যে সক্রিয় ছিল। অভিযোগে তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নামও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে প্লটটির বাজারমূল্য ৩০০ কোটি টাকারও বেশি। অথচ প্লটটি বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার সময় বলা হয়, এটি রাজউকের পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় নেই। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালে রাজউকের তৎকালীন সচিব মোহাম্মদ মোস্তফার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, প্লটটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে সেই গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করা হয়।

নথি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির আদেশ (পি.ও.-১৬/৭২) অনুসারে ১৯৭২ সালে প্লটটি সরকারি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়। পরবর্তীতে ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ তারিখে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আদেশে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এসব গেজেট ও সরকারি নথির অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও ১৯৭৬ সালের রিট মামলায় সরকারপক্ষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে আদালত প্লটটিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি নয় বলে রায় দেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সম্পত্তির মামলায় সরকারের আপিল না করা এবং রায় কার্যকরের ক্ষেত্রেও বাদীপক্ষের দীর্ঘ নীরবতা স্বাভাবিক নয়। তাদের মতে, বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।

সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, রাজউক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং এপিএমবির তালিকায় প্লটটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিভিন্ন সরকারি চিঠিপত্র, অনুসন্ধান ও তদন্তেও একই তথ্য উল্লেখ রয়েছে। ফলে কীভাবে এই প্লটকে পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকার বাইরে দেখানো হলো, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, অতীতে বিভিন্ন সময় একটি প্রভাবশালী চক্র প্লটটি দখলের চেষ্টা করলেও সফল হয়নি। তবে ২০২৩ সালে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেটি বেসরকারি মালিকানায় হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় এবং গণমাধ্যমেও তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি শুধু একটি মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি বেহাতের চেষ্টা নয়; বরং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসনের জন্যও একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। তাই পুরো ঘটনাটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের স্বার্থেই জরুরি।