বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির ইতিহাস যেমন আন্দোলন-সংগ্রামের, তেমনি ত্যাগ, নির্যাতন ও আত্মত্যাগেরও ইতিহাস। দীর্ঘ বছর ধরে অসংখ্য নেতা-কর্মী মামলা, কারাবরণ, হামলা, নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে টিকিয়ে রাখতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। কিন্তু দলের ভেতরের একাধিক নেতার দাবি, সেই পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের একটি বড় অংশ আজ নিজেদের অবহেলিত ও উপেক্ষিত মনে করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন মধ্যম সারির নেতা বলেন, বর্তমানে দলের কিছু সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী কয়েকজন নেতাকে ঘিরেই বেশি আলোচনা ও গুরুত্ব দেখা যায়। অথচ দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা বহু পরীক্ষিত নেতা ও তৃণমূলের কর্মীরা ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, “বড় বড় সমাবেশ ও মিছিলে বিপুল লোকসমাগম দেখানো হলেও যারা বছরের পর বছর রাজপথে থেকে দলের জন্য সংগ্রাম করেছেন, তাদের অনেকেই এখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। তারা মনে করছেন, তাদের অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।”
দলের আরেকজন সিনিয়র নেতা দাবি করেন, গত প্রায় ১৭ বছর ধরে যেসব নেতা কারাবরণ, নির্যাতন, মামলা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা সহ্য করেও বিএনপির পতাকা বহন করেছেন, তাদের অনেকেই এখন হতাশা ও মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছেন। তার ভাষায়, দীর্ঘদিনের ত্যাগের পরও প্রত্যাশিত সম্মান ও দায়িত্ব না পাওয়ায় অনেকেই নীরব হয়ে যাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার পরীক্ষিত ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতৃত্ব। যদি সেই নেতৃত্ব নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করেন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাদের মতে, বিএনপির অভিজ্ঞ ও ত্যাগী নেতাদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত রাখা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দলীয় নেতাদের একটি অংশের অভিযোগ, বর্তমানে দলের ভেতরে নতুন ও প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্যদিকে, যারা বহু বছর ধরে রাজপথে সংগ্রাম করেছেন, তাদের অনেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। যদিও এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দলের প্রবীণ নেতাদের মধ্যে নজরুল ইসলাম খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. মঈন খান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী,জয়নুল আবদিন ফারুক, শামসুজ্জামান দুদু, রুহুল কবির রিজভী, আমান উল্লাহ আমান এবং সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ আরও অনেক নেতা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দলীয় কর্মীদের একাংশের মতে, তাদের অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা এখনও দলের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ।
তৃণমূল পর্যায়ের অনেক কর্মীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন আন্দোলনে সক্রিয় থাকার পরও তারা দলীয় পদ কিংবা দায়িত্বের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পাননি। এই হতাশা ধীরে ধীরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির অতীতের গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল মূলত তৃণমূলের নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম, সাংগঠনিক শক্তি এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের মাধ্যমে। সেই শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে মাঠপর্যায়ের ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন করা জরুরি।
দলের অভ্যন্তরে আরও একটি অভিযোগ শোনা যায়—সংস্কারপন্থী বা নতুনভাবে যুক্ত হওয়া কিছু নেতা তুলনামূলক বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আদর্শে রাজনীতি করে আসা বহু নেতাকর্মী নিজেদের গুরুত্বহীন মনে করছেন। তবে এই অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং বিষয়টি নিয়ে দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থানও প্রকাশিত হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি দলের শক্তি কেবল নতুন নেতৃত্বে নয়; বরং অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রজন্মের সমন্বয়ে। অতীতের সংগ্রামী নেতাদের অবদানকে মূল্যায়ন করা হলে দল আরও সুসংগঠিত হতে পারে এবং তৃণমূলের কর্মীরাও নতুন করে অনুপ্রাণিত হবেন।
ইতিহাস সাক্ষী, রাজনৈতিক দলগুলো তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন তারা নিজেদের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের সম্মান দেয়, তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগায় এবং নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করতে সক্ষম হয়।
বিএনপির জন্যও আজ সেই বাস্তবতাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যারা বছরের পর বছর নির্যাতন, কারাবরণ, হামলা, মামলা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে টিকিয়ে রেখেছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা গেলে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে। অন্যদিকে, যদি তাদের হতাশা ও নীরবতা আরও বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সেই শূন্যতা পূরণ করা সহজ হবে না—এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট নেতাদের একটি অংশ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।