ঢাকা, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১১:২২:৩১ PM

চালের মজুত আছে, তবু কমছে না বাজারদর

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
11-07-2026 12:54:46 PM
চালের মজুত  আছে, তবু কমছে না বাজারদর

সরকারি গুদামে প্রায় ১৮ লাখ টন চালের মজুত, চলতি বোরো মৌসুমে বাম্পার উৎপাদন এবং চাল আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড় থাকা সত্ত্বেও দেশের বাজারে চালের দাম কমছে না। বরং ধান ও চালের দামের ব্যবধান আরও বেড়েছে। উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন কৃষক, অন্যদিকে মিল থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দাম বাড়তে বাড়তে চাল প্রায় দ্বিগুণ দামে ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে। এতে একদিকে কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে উচ্চমূল্যের বোঝা বইতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের।

বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চালের সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণে একটি প্রভাবশালী মিলার চক্রের নিয়ন্ত্রণ থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের দাবি, কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করার পর বাজারে অস্বাভাবিক উচ্চ দামে চাল বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভের বড় অংশ চলে যাচ্ছে মধ্যবর্তী পর্যায়ে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ জুলাই পর্যন্ত সরকারি গুদামে ধান, চাল ও গম মিলিয়ে ২২ লাখ ৫২ হাজার টনের বেশি খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮ লাখ টন চাল, ৩ লাখ ৩১ হাজার টন ধান এবং প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার টন গম রয়েছে। একই সঙ্গে চলতি বোরো মৌসুমে ১৮ লাখ মেট্রিক টন ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে সরকার।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন ও সরকারি মজুত থাকার পরও চালের দাম বাড়ার বিষয়টি স্বাভাবিক বাজার প্রতিযোগিতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে বোরো ধানের উৎপাদন সন্তোষজনক হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকেরা ভালো ফলন পেয়েছেন। কিন্তু সেই সুফল কৃষকের ঘরে পৌঁছায়নি। কারণ, ফসল ঘরে তোলার সময়ই তাঁদের কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়েছে।

পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা খরচ হয়। জমির ভাড়া, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় যোগ করলে খরচ আরও বেড়ে যায়। অথচ বর্তমানে প্রতি মণ ধান প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না, কিন্তু সেই ধান থেকেই উৎপাদিত চাল বাজারে অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়। কৃষকের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য মিলছে না।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী লতিফের রহমান জানান, গত এক মাসে মিলপর্যায়েই বিভিন্ন ধরনের চালের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে মিনিকেট, নাজিরশাইল ও পোলাও চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, মিল থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হওয়ায় খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। মিলপর্যায়ে দাম না বাড়লে বাজারেও দাম বাড়ত না।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল প্রতি কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উন্নত মানের পোলাও চালের দাম ১৭০ থেকে ১৯০ টাকা প্রতি কেজি। এক মাসের ব্যবধানে কিছু চালের ৫০ কেজির বস্তার দাম ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা নয়ন হোসেন বলেন, ধানের ভালো ফলন ও সরকারি মজুত থাকা সত্ত্বেও চালের দাম না কমায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তাঁর ভাষায়, বাজারে গেলে মনে হয় কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়িয়ে রেখেছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার।

সাভারের বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী শাহানা বেগম বলেন, পরিবারের মাসিক ব্যয়ের বড় অংশ এখন চাল কিনতেই চলে যাচ্ছে। অন্য নিত্যপণ্যের দামও বেশি থাকায় সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।

ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, চাল আমদানির এলসি সীমিত থাকায় বড় মিল মালিকরা বাজারে বেশি প্রভাব বিস্তার করছেন। তাঁদের মতে, প্রয়োজন হলে সরকারকে আরও বেশি আমদানির সুযোগ দিতে হবে, যাতে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে আসে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানিয়েছেন, চলতি বোরো মৌসুমে ১৮ লাখ মেট্রিক টন ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানিও অব্যাহত রাখা হবে। বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের খাদ্য মজুত স্বাভাবিক রাখতে সরকার অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চালের বাজারে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। মিল, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কেবল অভিযান পরিচালনা করে দীর্ঘমেয়াদে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। উৎপাদন থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং বড় মিল মালিকদের বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কমিয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)-এর সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, কৃষকের কাছ থেকে ৫০ কেজি ধান কিনতে প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা খরচ হয়। এই ধান থেকে প্রায় ২৫ কেজি চাল উৎপাদিত হয়। পাশাপাশি কুঁড়া, তুষ, খুদ ও ভাঙা চাল বিক্রি করেও মিল মালিকেরা আয় করেন। এরপরও মিলপর্যায়ে ৫০ কেজি চালের বস্তা প্রায় ৩ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা পাইকারি ও খুচরা বাজারে প্রায় ৪ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়। তাঁর মতে, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহন ব্যয় বিবেচনায় নিলেও এত বড় মূল্য ব্যবধান যৌক্তিক নয়। বাজারের কোনো একটি পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফা যোগ হচ্ছে, যার পুরো চাপ বহন করতে হচ্ছে ভোক্তাদের।