ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১১:৪২:৩৯ PM

মেট্রোরেলের আশীর্বাদ,পানির সংকটে মিরপুর

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.গেম
07-07-2026 08:00:20 PM
মেট্রোরেলের আশীর্বাদ,পানির সংকটে মিরপুর

রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে মেট্রোরেল। যাতায়াতের সময় ও ভোগান্তি কমিয়ে এটি নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে। বিশেষ করে মিরপুর অঞ্চলের বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছেন। কর্মজীবী মানুষ দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করতে পারায় মিরপুরে আবাসনের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে একের পর এক বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মিত হয়েছে এবং এলাকাটি বসবাসের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

তবে এই উন্নয়নের পাশাপাশি মিরপুরের বাসিন্দাদের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানির অভাব। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ওয়াসার পানির সংকট থাকলেও সম্প্রতি তা আরও তীব্র হয়েছে। মিরপুরের বিভিন্ন সেকশন, পল্লবী, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মনিপুর, পীরবাগসহ আশপাশের এলাকায় পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে পানি আসে না। কোথাও পানির চাপ এতটাই কম যে মোটর চালিয়েও পর্যাপ্ত পানি তোলা সম্ভব হয় না। ফলে রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া, বাসাবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং শিশু ও বয়স্কদের দৈনন্দিন পরিচর্যার মতো মৌলিক কাজও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে পানির জার কিনছেন অথবা বিকল্প উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। এতে তাদের মাসিক ব্যয়ও বেড়ে গেছে।

শুধু আবাসিক ভবন নয়, পানির সংকটের প্রভাব পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছোট ব্যবসা, রেস্তোরাঁ, মসজিদ এবং বিভিন্ন সেবাপ্রতিষ্ঠানেও। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ পানির অভাব ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি ব্যাহত করার পাশাপাশি সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও মনিপুর এলাকায় তীব্র পানি সংকট চলছে। অনেক এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় পানির কোনো সরবরাহ থাকে না। পানি এলেও অল্প সময়ের জন্য আসে এবং চাপ এত কম থাকে যে অনেক বাড়ির ট্যাংক পূর্ণ করা সম্ভব হয় না। ফলে বাসিন্দাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।

বেসরকারি চাকরিজীবী মোস্তাক আহমেদ পরিবার নিয়ে কাজীপাড়ায় ভাড়া থাকেন। তিনি বলেন, “মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর অফিসে যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু এখন পানির সংকট সেই স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। মাসের অধিকাংশ সময়ই লাইনে পানি থাকে না। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে।”

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান মিরপুরের বাইশবাড়ী এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজা। তিনি বলেন, “দুই মাস ধরে বাসায় ঠিকমতো পানি পাচ্ছি না। বিকল্পভাবে পানি সংগ্রহ করে সংসারের কাজ চালাতে হচ্ছে। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়মিত গোসল করানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। কতদিন এভাবে চলবে, জানি না।”

ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, সাভারের ভাকুর্তা পানি শোধনাগার থেকে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১২ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হয়, যার বড় অংশ বৃহত্তর মিরপুর এলাকায় বিতরণ করা হয়। ফলে এই শোধনাগারে সামান্য সমস্যাও মিরপুর অঞ্চলের পানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

ওয়াসা সূত্র জানায়, গত ২০ জুন ভাকুর্তা পানি শোধনাগারের ট্রান্সফর্মার ও জেনারেটরে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ওইদিন মাত্র ৭ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হয়। পরবর্তী দুই দিন প্রতিদিন ১০ কোটি লিটার করে পানি সরবরাহ করা হয়। ফলে তিন দিনে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৯ কোটি লিটার পানি কম সরবরাহ হয়, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মনিপুর ও আশপাশের এলাকায়।

তবে ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. এমদাদুল হক দাবি করেন, বর্তমানে মিরপুরে সামগ্রিকভাবে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ২০ থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত ভাকুর্তা শোধনাগারের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সাময়িক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়েছে।

তিনি বলেন, অনেক এলাকায় পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির মালিকরা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মোটর ব্যবহার করে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পানি টেনে নিচ্ছেন। ফলে লাইনের শেষ প্রান্তের বাড়িগুলোতে পানি পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে বাইশবাড়ী ও আশপাশের কিছু এলাকায় এ ধরনের পরিস্থিতি বেশি দেখা যাচ্ছে।

পানি সংকট নিরসনে চলমান উদ্যোগের কথা জানিয়ে এমদাদুল হক বলেন, কাজীপাড়ায় নতুন একটি গভীর নলকূপের বোরিংয়ের কাজ আগামী সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি ভূগর্ভস্থ পানির পাম্প স্থাপনের কাজ চলছে। তিনি নাগরিকদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সবাই যদি প্রয়োজন অনুযায়ী পানি ব্যবহার করেন, তাহলে সংকট অনেকটাই কমে আসবে।

তিনি আরও বলেন, মেট্রোরেল চালুর পর মিরপুরে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন নতুন বহুতল ভবন নির্মিত হলেও পানির নতুন পাম্প বসানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরবরাহব্যবস্থা সম্প্রসারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদা পূরণে সংস্থাটি প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি গভীর নলকূপ পরিচালনা করছে। এর মধ্যে শুধু মিরপুর জোনেই রয়েছে প্রায় ১৮০টি গভীর নলকূপ। পাশাপাশি নদীর পানি শোধন করেও সরবরাহ করা হচ্ছে। তবুও দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে, দীর্ঘদিনের পানি সংকটে ক্ষুব্ধ হয়ে গত ২৮ জুন শেওড়াপাড়ার শতাধিক বাসিন্দা বালতি ও পানির বোতল হাতে নিয়ে মূল সড়ক অবরোধ করেন। প্রায় ২০ মিনিট অবস্থানের পর ওয়াসা কর্তৃপক্ষ রাতের মধ্যেই পানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার আশ্বাস দিলে তারা অবরোধ তুলে নেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, ৭ জুলাই পর্যন্তও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

ওয়াসার জনতথ্য বিভাগের উপ-প্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদের বলেন, বর্তমানে বছরের অন্যান্য সময়ের মতোই পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে গ্রীষ্মকালে পানির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়, যার ফলে সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি সৃষ্টি হয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান উন্নয়নকাজ শেষ হলে শিগগিরই পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছাবে।

মেট্রোরেল মিরপুরবাসীর জীবনযাত্রায় যেমন নতুন গতি এনে দিয়েছে, তেমনি দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মৌলিক সেবার ওপরও চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে পানির সংকট এখন এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নাগরিক সমস্যাগুলোর একটি। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন গভীর নলকূপ স্থাপন, পানি সরবরাহ অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বিকল্প উৎস থেকে পানি সরবরাহ বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের সচেতন পানি ব্যবহারের মাধ্যমে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব। অন্যথায়, ভবিষ্যতে মিরপুরের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে পানির সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।