ঢাকা, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১১:৪৯:৩৯ PM

চার গুণ বেশি ব্যয়ে দেখিয়ে সায়েদাবাদ প্রকল্প

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
06-07-2026 08:36:31 PM
চার গুণ বেশি ব্যয়ে দেখিয়ে সায়েদাবাদ প্রকল্প

রাজধানী ঢাকার দীর্ঘমেয়াদি পানি সংকট নিরসনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের ফেজ-৩-এর ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে প্রাথমিক ব্যয়ের প্রায় চার গুণে পৌঁছেছে। ২০১৫ সালে প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। পরবর্তী সংশোধনের মাধ্যমে তা বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। একই সময়ে বাস্তবায়নাধীন গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পের ব্যয় ১০ হাজার ৯৭৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা হলেও অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও বাস্তবায়নের অগ্রগতির দিক থেকে প্রকল্পটি এগিয়ে রয়েছে। ফলে সায়েদাবাদ প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প ঢাকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মেঘনা নদীর পানি পরিশোধনের মাধ্যমে রাজধানীতে নিরাপদ ও টেকসই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। শুরুতে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে পরিশোধন করা হলেও নদীটির পানি দূষিত হয়ে পড়ায় পরে মেঘনা নদীকে প্রধান উৎস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। আধুনিক পানি শোধন প্রযুক্তির মাধ্যমে নদীর পানি সংগ্রহ, রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিশোধন, ফিল্টারিং এবং জীবাণুমুক্ত করার পর তা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে ফেজ-৩ সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ, যেখানে নতুন ইনটেক স্টেশন, দীর্ঘ ট্রান্সমিশন পাইপলাইন, শক্তিশালী পাম্পিং ব্যবস্থা এবং বিদ্যমান প্ল্যান্টের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মাধ্যমে ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য নিরাপদ পানির সরবরাহ বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রথমে ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। পরে প্রথম সংশোধনে ব্যয় বাড়িয়ে ৭ হাজার ৫১৮ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং মেয়াদ ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এরপর দ্বিতীয় সংশোধনে ব্যয় এক লাফে বেড়ে ১৬ হাজার ১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। অথচ সংশোধনের সময় পর্যন্ত প্রকল্পের মূল কাজের বাস্তব অগ্রগতি ছিল ১০ শতাংশেরও কম।

২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল মাত্র ১৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ছিল শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ। এর পর থেকে নিয়ম অনুযায়ী মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

একই ধরনের গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যয়ের অসামঞ্জস্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গন্ধর্বপুর প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ১০ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা হলেও এতে ১০৫ কোটি লিটার ক্ষমতার ইনটেক এবং দৈনিক ৫০ কোটি লিটার ক্ষমতার পানি শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিপরীতে সায়েদাবাদ ফেজ-৩ প্রকল্পে ৯৫ কোটি লিটার ক্ষমতার ইনটেক এবং ৪৫ কোটি লিটার ক্ষমতার শোধনাগারের পরিকল্পনা রয়েছে।

পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কেও গন্ধর্বপুর প্রকল্প তুলনামূলকভাবে বড়। সেখানে ৭২ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন পাইপলাইন, ৬৭ কিলোমিটার প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি পাইপলাইন, ১৬টি ডিস্ট্রিক্ট মিটার্ড এরিয়া (ডিএমএ), প্রায় ৪৯৮ কিলোমিটার নেটওয়ার্ক, ৫০টি গভীর নলকূপ, ১ হাজার ৫৫০টি টয়লেট ও গোসলখানা নির্মাণ এবং ২০০ একর জমি অধিগ্রহণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সায়েদাবাদ প্রকল্পে এসব অতিরিক্ত অবকাঠামোর উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবুও প্রকল্পটির ব্যয় গন্ধর্বপুরের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।

ব্যয়ের বিভিন্ন খাত বিশ্লেষণেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। সায়েদাবাদ প্রকল্পের প্রথম কম্পোনেন্টেই ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ২৩২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যা গন্ধর্বপুর প্রকল্পের মোট ব্যয়ের চেয়েও বেশি। এছাড়া কাস্টম ডিউটি বাবদ সায়েদাবাদ প্রকল্পে ১ হাজার ৭৮১ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে গন্ধর্বপুর প্রকল্পে একই খাতে ব্যয় ১ হাজার ২৬৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও সায়েদাবাদ প্রকল্পে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও পঞ্চম গ্রেডের একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্পের পরিচালক হওয়ার জন্য অন্তত তৃতীয় গ্রেডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম ব্যয়ের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে বলেন, সায়েদাবাদ ফেজ-৩ প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ৯৫ কোটি লিটার পানি শোধনের সক্ষমতা তৈরি হবে। এর মধ্যে সাড়ে ২২ কোটি লিটার করে সায়েদাবাদ-১ ও ফেজ-২-এ সরবরাহ করা হবে এবং অবশিষ্ট ৫০ কোটি লিটার ফেজ-৩ থেকে সরবরাহ করা হবে। এ কারণেই প্রকল্পটির ব্যয় তুলনামূলক বেশি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে তিনি জানান, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের আগেই নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে, তাই এ বিষয়ে তাঁর কোনো মন্তব্য নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর টেকসই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্যয় বৃদ্ধি, বাস্তবায়নের ধীরগতি, অগ্রগতি প্রতিবেদনের অনিয়ম এবং একই ধরনের প্রকল্পের তুলনায় ব্যয়ের বড় ব্যবধান প্রকল্পটির আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে যথাযথ তদন্ত ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।