ঢাকা, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৩:২৫:১৫ AM

সংসদীয় কার্যক্রমে নতুন পরিবেশ ও প্রতীকী

মান্নান মারুফ
12-07-2026 09:24:55 PM
সংসদীয় কার্যক্রমে নতুন পরিবেশ ও প্রতীকী

ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সংসদ ভবনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা হয়েছে। জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে সংসদ ভবনের নান্দনিকতা, ঐতিহাসিক চেতনা এবং প্রতীকী উপস্থাপনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। সরকার বলছে, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো জাতীয় পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতীককে সংসদ ভবনের বিভিন্ন স্থানে আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা।

সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো সংসদ অধিবেশন কক্ষে স্পিকারের আসনের পেছনের উঁচু দেয়ালে আরবি ক্যালিগ্রাফিতে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ" স্থাপন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এই ক্যালিগ্রাফি স্থাপন করা হয়েছে। সংসদ ভবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এই ক্যালিগ্রাফি সংযোজনের ফলে অধিবেশন কক্ষের দৃশ্যমান পরিবেশে একটি নতুন প্রতীকী মাত্রা যুক্ত হয়েছে। সরকার ও একাধিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এটি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্পিকারের আসনের পেছনে পূর্বে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতির পরিবর্তে কালিমার ক্যালিগ্রাফি স্থাপন। চিফ হুইপের বক্তব্য অনুযায়ী, আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ধর্মীয় পরিচয় ও বিশ্বাসের প্রতীকী উপস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি উদ্যোগ। বিষয়টি রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত প্রকাশিত হয়েছে।

সংসদ ভবনের অভ্যন্তরে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বিভিন্ন গ্যালারির নামকরণে। আগে সংসদের গ্যালারিগুলোর নাম ছিল বাংলাদেশের নদী ও ফুলের নামে, যেমন—শিমুল, শিউলি, বকুল, শাপলা, যমুনা প্রভৃতি। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের নামে নামকরণ করা হয়েছে। সরকারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, দেশের সর্বোচ্চ বীরত্বের খেতাবপ্রাপ্ত এই সাত বীর সেনানীর আত্মত্যাগ ও অবদানকে জাতীয় সংসদের মতো সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানে আরও দৃশ্যমান ও সম্মানজনকভাবে তুলে ধরাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

বীরশ্রেষ্ঠদের নামে গ্যালারির নামকরণকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে বীরত্বগাথা পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংসদে আগত দেশি-বিদেশি অতিথি, গবেষক এবং দর্শনার্থীদের কাছেও এ উদ্যোগ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে আরও অর্থবহভাবে উপস্থাপন করবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

সংসদ ভবনের প্রধান প্রবেশপথেও আনা হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। নতুন নামফলক স্থাপনের মাধ্যমে প্রধান গেটের নাম রাখা হয়েছে "জেনারেল এম এ জি ওসমানী গেট"। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর নামে এই নামকরণ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য নেতৃত্ব ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব দৃশ্যমান পরিবর্তনের পাশাপাশি সংসদের প্রশাসনিক কার্যক্রমেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শুরুতে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার তাঁদের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমও সম্পন্ন হয়েছে। সংসদের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, গতিশীল এবং সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদ ভবনে আনা এসব পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে স্পিকারের আসনের পেছনে কালিমার ক্যালিগ্রাফি স্থাপন, গ্যালারিগুলোর নাম বীরশ্রেষ্ঠদের নামে পরিবর্তন এবং প্রধান প্রবেশপথের নতুন নামকরণ। এসব পরিবর্তন শুধু স্থাপত্য বা সাজসজ্জার বিষয় নয়; বরং জাতীয় পরিচয়, ধর্মীয় প্রতীক এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুনভাবে উপস্থাপনের একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্রের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ফলে সংসদ ভবনে আনা প্রতিটি দৃশ্যমান পরিবর্তন সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়াই স্বাভাবিক। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সূচনালগ্নে গৃহীত এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতের সংসদীয় কার্যক্রমে নতুন পরিবেশ ও প্রতীকী তাৎপর্য যোগ করবে।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সংসদ ভবনে যে পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে, তার মধ্যে স্পিকারের আসনের পেছনে কালিমার ক্যালিগ্রাফি স্থাপন, গ্যালারিগুলোর নাম সাত বীরশ্রেষ্ঠের নামে পরিবর্তন এবং প্রধান প্রবেশপথের নাম "জেনারেল এম এ জি ওসমানী গেট" রাখা—এসবই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও দৃশ্যমান পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।