ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ১০:৫৩:৫২ PM

উপন্যাস: মুক্তিচাই

মান্নান মারুফ
02-04-2026 08:51:28 PM
উপন্যাস: মুক্তিচাই

দ্বিতীয় পর্ব: 

কারাগারের ভেতরের সময় যেন আলাদা এক নদী—যার স্রোত নেই, গতি নেই, শুধু জমে থাকা নিঃশব্দ জল।

আমি দ্বিতীয়বার যখন শওকত মাহমুদের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, তখন আকাশটা পরিষ্কার ছিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে আমার ভেতরে এক ধরনের ভার জমে ছিল।

প্রথম দিনের সেই ভাঙা মুখ, ক্লান্ত চোখ—সেটা যেন আমার মাথা থেকে সরছিল না।

গারদের ভেতরে ঢুকতেই আগের সেই গুমোট গন্ধ, সেই নিস্তব্ধতা আবার আমাকে ঘিরে ধরল।

তিনি এবার জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

একটা ছোট্ট জানালা—লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে আকাশের এক টুকরো আলো দেখা যায়।
তিনি সেদিকেই তাকিয়ে ছিলেন, যেন ওই ছোট্ট নীল অংশটাই তার পৃথিবী।

“আবার এসেছ?”—পেছন ফিরে না তাকিয়েই বললেন তিনি।

আমি এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম।
“আপনার সাথে কিছু কথা বলতে ইচ্ছে করছিল।”

তিনি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন।
চোখে আজ একটু অন্যরকম আলো—হয়তো স্মৃতির আলো।

“কথা? এখানে কথা বলার মতো কিছু থাকে না। শুধু স্মৃতি থাকে।”

আমি মৃদু হেসে বললাম,
“তাহলে আজ স্মৃতির কথাই বলুন।”

তিনি একটু চুপ করে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়লেন, আমাকেও বসতে ইশারা করলেন।

“তুমি কি জানো,”—তিনি শুরু করলেন—
“একসময় আমি প্রতিদিন সকাল শুরু করতাম খবরের কাগজ দিয়ে… নিজের লেখা, নিজের সম্পাদিত শিরোনাম দেখে মনে হতো—আমি যেন সময়কে ছুঁয়ে ফেলেছি।”

তার কণ্ঠে এক ধরনের গর্বের সুর ভেসে উঠল, কিন্তু মুহূর্তেই সেটা মিলিয়ে গেল।

“জাতীয় প্রেসক্লাব… সেই ভিড়, সেই তর্ক, সেই উত্তেজনা—সবকিছু যেন এখন স্বপ্নের মতো লাগে।”

আমি চুপচাপ শুনছিলাম।

“রাজনীতি…”—তিনি একটু থামলেন—
“এটা একটা নেশা। একবার ঢুকে গেলে আর বের হওয়া যায় না। তুমি ভাবো তুমি নিয়ন্ত্রণে আছো, কিন্তু আসলে রাজনীতিতে ঢুকলে নিয়ন্ত্রণটা অন্য কারও হাতে থাকে।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনি কি কখনও মনে করেন, আপনি ভুল করেছিলেন?”

প্রশ্নটা শুনে তিনি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে গেলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“ভুল? মানুষ ভুল করেই শেখে। কিন্তু রাজনীতিতে ভুলের মূল্যটা অনেক বড়।”

তার চোখে হঠাৎ এক ধরনের ব্যথা ফুটে উঠল।

“আমি ভেবেছিলাম, আমি মানুষের জন্য কাজ করছি। সত্য বলছি। কিন্তু একসময় দেখলাম, সত্যটা আর সত্য থাকে না—এটা হয়ে যায় অস্ত্র।”

আমি অনুভব করলাম, তার ভেতরের মানুষটা এখনও লড়ছে—নিজের সঙ্গে, নিজের অতীতের সঙ্গে।

“আপনি কি কখনও ভয় পান?”—আমি জানতে চাইলাম।

তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“ভয়? আগে পেতাম। এখন আর পাই না। কারণ আমি সব হারিয়ে ফেলেছি।”

কথাটা শুনে আমার বুকটা কেঁপে উঠল।

“সব?”

তিনি মাথা নেড়ে বললেন,
“সম্মান, অবস্থান, মানুষ… সব। শুধু একটা জিনিস বাকি আছে।”

আমি তাকিয়ে রইলাম।

তিনি জানালার দিকে ইশারা করলেন।

“আশা।”

আমি অবাক হয়ে গেলাম।

এই মানুষটা, যিনি এত কিছু হারিয়েছেন, তিনি এখনও আশার কথা বলেন!

“জানো,”—তিনি আবার বললেন—
“প্রতিদিন রাতে আমি একটা স্বপ্ন দেখি…”

আমি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
“কী স্বপ্ন?”

তার চোখে হালকা ঝিলিক দেখা দিল।

“আমি আবার মুক্ত। এই শিকল নেই, এই দেয়াল নেই। আমি হাঁটছি—খোলা আকাশের নিচে… মানুষ আমাকে দেখছে, কিন্তু কেউ আমাকে চিনতে পারছে না।”

তিনি একটু থামলেন।

“সেই স্বপ্নে আমি খুব শান্তি পাই।”

তার কণ্ঠে এক ধরনের অদ্ভুত প্রশান্তি ছিল।

আমি বুঝতে পারলাম, এই কারাগারের ভেতরে তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়—তার স্বপ্ন।

কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল।

দূরে কোথাও একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

আমি উঠে দাঁড়ালাম।

“আমি আবার আসব,”—বললাম।

তিনি মৃদু হাসলেন।

“এসো। বাইরে যারা থাকে, তারা যেন ভেতরের মানুষগুলোর কথা ভুলে না যায়।”

আমি ধীরে ধীরে বের হয়ে এলাম।

কারাগারের দরজা পেরিয়ে বাইরে এসে যখন আকাশের দিকে তাকালাম, তখন হঠাৎ মনে হলো—
মুক্তি শুধু বাইরে থাকার নাম নয়, মুক্তি একটা অনুভূতি।

আর সেই অনুভূতির জন্যই হয়তো শওকত মাহমুদ এখনও বেঁচে আছেন।

(চলবে…)